পাঠ ১৩ / ১৩অনুচ্ছেদ ৪.২০–৪.২১.১
বন্ধনশক্তি, গঠন তাপ ও হেসের সূত্রBond energies, standard enthalpy of formation & Hess's law
গ্যাসের চুলায় মিথেন (methane, CH₄) পোড়ে, আর আমরা তাপ পাই। অথচ পোড়ার সময় প্রথমে CH₄ আর O₂ অণুর রাসায়নিক বন্ধন (chemical bond) ভাঙতে হয় — আর বন্ধন ভাঙতে শক্তি লাগে। নিচের আণবিক মডেলে (molecular model) নিজে বন্ধন ভেঙে আর জুড়ে দেখো, শক্তির মিটার কোথায় যায়:
মিথেন (methane, CH₄) আর অক্সিজেন (oxygen, O₂) অণু। কোনো বন্ধনে (bond) চাপ দিয়ে সেটি ভাঙো — ডান পাশের শক্তি মিটারে (energy meter) চোখ রাখো।
গড় বন্ধনশক্তি (average bond enthalpy), kJ/mol: C–H 413, O=O 498, C=O (CO₂-তে) 799, O–H 463। পানি এখানে গ্যাস (g)।
- CH₄ আর O₂-এর ৬টি বন্ধন (bond) ভাঙো।
- মুক্ত পরমাণুগুলো (atoms) CO₂ আর H₂O-তে সাজাও।
- নতুন ৬টি বন্ধন জোড়ো — মিটার শুরুর চেয়ে কোথায় থামল?
বন্ধন ভাঙতে 2648 kJ শক্তি দিতে হলো, তবু শেষে তাপ বেরিয়ে এল কেন? আর এই হিসাব কি সব বিক্রিয়ায় খাটে? যে বিক্রিয়া ল্যাবে ঘটানোই যায় না, তার তাপ জানব কীভাবে?
এই পাঠে ধাপে ধাপে এগোব:
- ঝালাই — এনথালপি পরিবর্তন (enthalpy change, ΔH), তাপোৎপাদী (exothermic) ও তাপহারী (endothermic)
- বন্ধনশক্তি (bond energy) ও গড় বন্ধনশক্তি (average bond enthalpy)
- বন্ধনশক্তি থেকে বিক্রিয়া তাপ (heat of reaction)
- প্রমাণ গঠন তাপ (standard enthalpy of formation, ΔfH°)
- ল্যাভয়সিয়ে-ল্যাপলাস সূত্র (Lavoisier–Laplace law) ও হেসের সূত্র (Hess’s law)
- হেসের সূত্রের প্রয়োগ (applications) — অজানা গঠন তাপ, রূপভেদ (allotropes), জ্বালানি (fuel)
- এবার নিজে করে দেখো — সিমুলেশন (simulation)
ধাপ ১: ঝালাই — ΔH কী বলে
আগের পাঠে (বিক্রিয়া তাপ ও ক্যালরিমিতি) দেখেছি: স্থির চাপে (constant pressure) কোনো বিক্রিয়ায় যে তাপ বের হয় বা শোষিত হয়, তা-ই এনথালপি পরিবর্তন (enthalpy change):
- ঋণাত্মক (negative) → তাপোৎপাদী (exothermic): তাপ বেরিয়ে যায়, যেমন জ্বালানির দহন (combustion)।
- ধনাত্মক (positive) → তাপহারী (endothermic): তাপ শোষিত হয়, যেমন চুনাপাথর (CaCO₃) ভেঙে চুন (CaO) তৈরি।
কয়েকটি বিশেষ নামের বিক্রিয়া তাপ, সব প্রতি মোল (per mole) হিসাবে:
| নাম | কী ঘটে | উদাহরণ (kJ/mol) |
|---|---|---|
| দহন তাপ (heat of combustion, ΔcH) | 1 mol পদার্থ অক্সিজেনে সম্পূর্ণ পোড়ে | CH₄: −890.3 |
| গঠন তাপ (heat of formation, ΔfH) | মৌল (element) থেকে 1 mol যৌগ (compound) তৈরি | H₂O(l): −285.8 |
| পরমাণুকরণ তাপ (heat of atomisation) | মৌল থেকে 1 mol গ্যাসীয় পরমাণু (gaseous atoms) | ½H₂ → H: +218.0 |
| ঊর্ধ্বপাতন তাপ (heat of sublimation) | কঠিন সরাসরি গ্যাস হয় | C(graphite) → C(g): +716.7 |
নিচের কোন পরিবর্তনটি তাপোৎপাদী (exothermic)?
ধাপ ২: বন্ধনশক্তি
দুটি পরমাণুকে একসঙ্গে ধরে রাখে সমযোজী বন্ধন (covalent bond)। বন্ধনটি ভাঙতে হলে বাইরে থেকে শক্তি দিতে হয়।
বন্ধনশক্তি (bond energy / bond enthalpy): গ্যাসীয় অবস্থায় (gaseous state) 1 mol নির্দিষ্ট বন্ধন ভেঙে মুক্ত গ্যাসীয় পরমাণু (বা মূলক, radical) তৈরি করতে যে শক্তি লাগে। যেমন:
দুটি কথা মনে রাখো:
- বন্ধন ভাঙা সবসময় তাপহারী (ΔH ধনাত্মক) — টেনে আলাদা করতে শক্তি লাগে।
- বন্ধন গঠন সবসময় তাপোৎপাদী — একই বন্ধন গঠনে ঠিক ততটাই শক্তি বেরিয়ে যায়: , kJ/mol।
H₂, Cl₂, HCl-এর মতো দ্বিপরমাণুক (diatomic) অণুতে একটিই বন্ধন, তাই এদের বন্ধনশক্তি একটি নির্দিষ্ট, মাপা মান। কিন্তু পানির (H₂O) মতো অণুতে দুটি O–H বন্ধন — দুটি কি একই শক্তিতে ভাঙে? নিজে টেনে দেখো:
“একটি H টেনে আলাদা করো” চাপো — H₂O থেকে প্রথম H পরমাণু (atom) ছিঁড়ে আনতে কত শক্তি লাগে?
ধাপে ধাপে বন্ধন বিয়োজন শক্তি (stepwise bond dissociation enthalpy), 298 K: H₂O — Luo (2007); CH₄ — প্রথম ধাপ 439 (Luo), পরের ধাপগুলো আনুমানিক (approximate), তবে চারটির যোগফল CH₄-এর পরমাণুকরণ তাপের (atomisation enthalpy) সমান, 1663 kJ/mol।
প্রথম H টানতে লাগে 497 kJ/mol, কিন্তু বাকি •OH থেকে দ্বিতীয়টি টানতে মাত্র 428 kJ/mol — কারণ প্রথম H চলে যাওয়ার পর O-এর চারপাশের ইলেকট্রন বিন্যাস (electron arrangement) বদলে যায়। তাই বহুপরমাণুক (polyatomic) অণুর জন্য ব্যবহার করা হয় গড় বন্ধনশক্তি (average bond enthalpy):
সারণির C–H, C–C, O–H মানগুলো আসলে বহু যৌগের গড়। কোনো একটি নির্দিষ্ট অণুতে আসল মান একটু কম-বেশি হতে পারে।
গঠন তাপ থেকে গড় C–H বন্ধনশক্তি
CH₄ সম্পূর্ণ ভেঙে C(g) + 4H(g) বানাতে যে শক্তি লাগে, তা তিন ধাপে ভাবা যায়: CH₄ থেকে মৌলে ফেরা (), গ্রাফাইটের ঊর্ধ্বপাতন (), আর 2 mol H₂ পরমাণুতে ভাঙা ():
বহু যৌগের গড় ধরলে C–H ≈ 413 kJ/mol। কিছু গড় বন্ধনশক্তি (298 K):
| বন্ধন | kJ/mol | বন্ধন | kJ/mol | বন্ধন | kJ/mol |
|---|---|---|---|---|---|
| H–H | 436 | C–H | 413 | C=O (CO₂-তে) | 799 |
| O=O | 498 | C–C | 348 | C=O (অ্যালডিহাইড/কিটোন) | 745 |
| N≡N | 945 | C=C | 614 | O–H | 463 |
| Cl–Cl | 243 | C≡C | 839 | N–H | 391 |
| H–Cl | 432 | C–Cl | 339 | C–O | 358 |
উৎস (source): দ্বিপরমাণুক মান NIST / Luo (2007); গড় মান Housecroft & Sharpe, Atkins-এর সারণি।
বন্ধনের সংখ্যা যত বাড়ে (একক → দ্বিবন্ধন → ত্রিবন্ধন), বন্ধনশক্তির কী হয়?
ধাপ ৩: বন্ধনশক্তি থেকে বিক্রিয়া তাপ
রাসায়নিক বিক্রিয়া মানে পুরোনো বন্ধন ভাঙা আর নতুন বন্ধন গড়া। ভাঙতে শক্তি লাগে, গড়তে শক্তি বের হয়। তাই:
অর্থাৎ বিক্রিয়কের মোট বন্ধনশক্তি থেকে উৎপাদের মোট বন্ধনশক্তি বিয়োগ। গঠিত বন্ধনগুলো বেশি শক্ত হলে ΔH ঋণাত্মক — বিক্রিয়া তাপোৎপাদী।
উদাহরণ:
মাপা মান (measured) −184.6 kJ — প্রায় হুবহু, কারণ তিনটিই দ্বিপরমাণুক অণু, কোনো গড় মান লাগেনি।
শুরুর প্রশ্নের উত্তর: মিথেনের দহনে ভাঙতে হয় 4টি C–H আর 2টি O=O ( kJ), কিন্তু গড়ে ওঠে 2টি C=O আর 4টি O–H ( kJ)। নতুন বন্ধনগুলো বেশি শক্ত, তাই kJ — তাপ বের হয়। বন্ধন ভাঙার শক্তিটা আসলে “বিনিয়োগ”, যা নতুন বন্ধন গড়ার সময় সুদে-আসলে ফেরত আসে।
নিচে নিজে হিসাব করো। প্রতিটি বন্ধনে চাপ দিলে সেটি ঠিক ঘরে যাবে, আর শেষে ΔfH° থেকে পাওয়া প্রকৃত মানের সাথে মিলিয়ে দেখাবে:
বিক্রিয়কের (reactants) প্রতিটি বন্ধনে চাপ দিলে সেটি ভাঙা ঘরে যাবে, উৎপাদের (products) প্রতিটি বন্ধনে চাপ দিলে গঠিত ঘরে। সব গ্যাস (g)।
ভাঙা বন্ধন (bonds broken): শক্তি লাগে, +
গঠিত বন্ধন (bonds formed): শক্তি বের হয়, −
অনুমান আর মাপা মানে পার্থক্য কেন?
- গড় মান: C–H, C–C, C=C সারণির মান বহু যৌগের গড়। ইথিনের C–H আর ইথেনের C–H হুবহু এক নয়, তাই C₂H₄ + H₂-তে অনুমান −124, মাপা মান −136.4 kJ।
- শুধু গ্যাস: বন্ধনশক্তি গ্যাসীয় অণুর জন্য সংজ্ঞায়িত। কোনো পদার্থ তরল বা কঠিন হলে অণুগুলোর মধ্যের আকর্ষণ (intermolecular forces) ছাড়াতেও শক্তি লাগে, যা বন্ধনশক্তির হিসাবে নেই। তাই হিসাবের আগে সব পদার্থ গ্যাস (g) কি না দেখে নাও।
গড় বন্ধনশক্তি দিয়ে N₂ + 3H₂ → 2NH₃ বিক্রিয়ার ΔH কত? (N≡N 945, H–H 436, N–H 391 kJ/mol)
ধাপ ৪: প্রমাণ গঠন তাপ
বন্ধনশক্তি দিয়ে শুধু অনুমান হয়। নির্ভুল হিসাবের জন্য ব্যবহার করা হয় প্রমাণ গঠন তাপ (standard enthalpy of formation, ΔfH°)।
সংজ্ঞা: প্রমাণ অবস্থায় (standard state: 298 K বা 25 °C, 1 bar চাপ) কোনো যৌগের 1 mol তার উপাদান মৌলগুলো (elements) থেকে — মৌলগুলো তাদের সবচেয়ে স্থিতিশীল রূপে (most stable form) থেকে — তৈরি হলে যে এনথালপি পরিবর্তন হয়। যেমন:
প্রমাণ অবস্থায় মৌলের ΔfH° = 0 — নিজের থেকে নিজেকে বানাতে কোনো পরিবর্তন নেই। তবে “সবচেয়ে স্থিতিশীল রূপ” কথাটা জরুরি: কার্বনের জন্য গ্রাফাইট (graphite) শূন্য, হীরা (diamond) নয় (+1.9); অক্সিজেনের জন্য O₂(g) শূন্য, ওজোন O₃ নয়।
| যৌগ | ΔfH° (kJ/mol) | যৌগ | ΔfH° (kJ/mol) |
|---|---|---|---|
| H₂O(l) | −285.8 | CH₄(g) | −74.6 |
| H₂O(g) | −241.8 | C₂H₆(g) | −84.0 |
| CO₂(g) | −393.5 | C₂H₄(g) | +52.4 |
| CO(g) | −110.5 | C₂H₂(g) | +227.4 |
| CaCO₃(s) | −1207.6 | C₂H₅OH(l) | −277.6 |
| CaO(s) | −634.9 | NH₃(g) | −45.9 |
উৎস: NIST-JANAF / CODATA / NBS সারণি, 298.15 K।
ΔfH° জানা থাকলে যেকোনো বিক্রিয়ার তাপ এক লাইনে বের হয়:
এখানে = সমতাকৃত সমীকরণের (balanced equation) সহগ (coefficient)। কেন কাজ করে? নিচের চিত্রে প্রতিটি যৌগ তার ΔfH° উচ্চতায় বসে আছে, আর মৌলগুলো সবাই 0-তে। বিক্রিয়কদের ভেঙে মৌলে ফিরিয়ে, তারপর মৌল থেকে উৎপাদ বানালেও একই জায়গায় পৌঁছাই:
CH₄(g) + 2O₂(g) → CO₂(g) + 2H₂O(l)
প্রতিটি যৌগ (compound) তার ΔfH° উচ্চতায় বসে আছে, মৌলগুলো 0-তে। বোতাম চেপে দেখো, মৌলের পথে ঘুরে গেলেও একই ΔH পাওয়া যায় কি না।
ΔfH° (kJ/mol), NIST/NBS: (−74.6) (বিক্রিয়ক) · (−393.5) + 2×(−285.8) (উৎপাদ)। O₂, H₂-এর মতো মৌলের ΔfH° = 0। মাপ অনুযায়ী (to scale)।
উদাহরণ: মিথেনের দহন,
ΔfH°: CaCO₃ −1207.6, CaO −634.9, CO₂ −393.5 kJ/mol হলে CaCO₃ → CaO + CO₂ বিক্রিয়ার ΔH কত?
ধাপ ৫: ল্যাভয়সিয়ে-ল্যাপলাস সূত্র ও হেসের সূত্র
ভর ও শক্তির নিত্যতা (conservation of mass and energy) থেকে তাপ রসায়নের দুটি সূত্র আসে। এদের বলে তাপ রসায়নের সূত্র (laws of thermochemistry)।
ল্যাভয়সিয়ে-ল্যাপলাস সূত্র (Lavoisier–Laplace law, 1780)
কোনো বিক্রিয়ায় যে এনথালপি পরিবর্তন হয়, বিক্রিয়াটি উল্টো দিকে ঘটলে ঠিক সমান পরিমাণ পরিবর্তন হয়, শুধু চিহ্ন উল্টো।
CuO গঠনে Cu–O বন্ধন তৈরি হয় (তাপ বের হয়); ভাঙতে ঠিক ততটাই তাপ লাগে।
হেসের সূত্র (Hess’s law of constant heat summation, 1840)
কোনো বিক্রিয়ার প্রারম্ভিক (initial) ও শেষ (final) অবস্থা একই থাকলে, বিক্রিয়াটি এক ধাপে হোক বা একাধিক ধাপে, মোট এনথালপি পরিবর্তন একই হবে।
কারণ এনথালপি একটি অবস্থা অপেক্ষক (state function) — পাহাড়ের চূড়ার উচ্চতার মতো, কোন রাস্তায় উঠলে তা কিছু যায় আসে না। যেমন কার্বন থেকে CO₂:
- সরাসরি (direct): , kJ
- দুই ধাপে (two steps): , kJ; তারপর , kJ
অর্থাৎ কোনো বদ্ধ চক্র (closed cycle) পুরো ঘুরে শুরুতে ফিরলে মোট ΔH = 0। তীরের দিকে গেলে ΔH যোগ, উল্টো দিকে গেলে −ΔH যোগ (এটিই ল্যাভয়সিয়ে-ল্যাপলাস)। হলুদ বিন্দুটিকে চক্রে ঘুরিয়ে নিজে দেখো, আর তৃতীয় চক্রে অজানা x বের করো:
হলুদ বিন্দুটি শুরুর অবস্থায় আছে। একটি বাক্সে বা নিচের বোতামে চাপ দিয়ে তীর ধরে এগোও — পুরো ত্রিভুজ ঘুরে আবার শুরুতে ফেরো।
সমস্যা সমাধানের দুই পদ্ধতি
- শক্তি চক্র পদ্ধতি (energy cycle method): ওপরের মতো চক্র আঁকো; দুই পথের ΔH সমান ধরে অজানাটি বের করো।
- বীজগাণিতিক পদ্ধতি (algebraic method): দেওয়া সমীকরণগুলোকে সাধারণ বীজগণিতের সমীকরণের মতো ব্যবহার করো — দরকার হলে উল্টাও (ΔH × −1), কোনো সংখ্যা দিয়ে গুণ করো (ΔH × n), তারপর যোগ করো। দুই পাশে একই পদার্থ থাকলে কাটাকাটি করো, যতক্ষণ না লক্ষ্য সমীকরণ (target equation) পাও।
2H₂(g) + O₂(g) → 2H₂O(l), ΔH = −571.6 kJ। তাহলে H₂O(l) → H₂(g) + ½O₂(g) বিক্রিয়ার ΔH কত?
ধাপ ৬: হেসের সূত্রের প্রয়োগ
ক. যে যৌগ সরাসরি বানানো যায় না, তার গঠন তাপ
কার্বন আর হাইড্রোজেন মিশিয়ে গরম করলে পরিষ্কারভাবে মিথেন তৈরি হয় না — তাই -এর তাপ সরাসরি মাপা যায় না। কিন্তু C, H₂ আর CH₄ — তিনটির দহন তাপ ক্যালরিমিটারে সহজে মাপা যায়। তিনটি পুড়েই শেষে একই CO₂ + H₂O হয়, তাই চক্র বানানো যায়:
বীজগাণিতিকভাবে: (দহন C) + 2 × (দহন H₂) − (দহন CH₄):
একইভাবে অ্যাসিটিলিনের (acetylene, C₂H₂) জন্য পাওয়া যায় kJ/mol — ধনাত্মক। অর্থাৎ C₂H₂ তার মৌলগুলোর চেয়ে বেশি শক্তি জমিয়ে রাখে, একে বলে তাপহারী যৌগ (endothermic compound)। এজন্যই অক্সি-অ্যাসিটিলিন শিখা (oxy-acetylene flame) এত গরম।
খ. খুব ধীর বিক্রিয়ার তাপ — রূপভেদ (allotropes)
গ্রাফাইট থেকে হীরা বা রম্বিক (rhombic) সালফার থেকে মনোক্লিনিক (monoclinic) সালফারে রূপান্তর এত ধীরে ঘটে যে তাপ মাপা অসম্ভব। দুই রূপের দহন তাপের পার্থক্যই উত্তর:
গ. জ্বালানির মান (fuel value)
দহন তাপকে মোলার ভর (molar mass) দিয়ে ভাগ করলে পাওয়া যায় প্রতি গ্রামে কত তাপ — জ্বালানি বাছাইয়ে এটিই কাজের সংখ্যা:
| জ্বালানি | ΔcH° (kJ/mol) | M (g/mol) | kJ/g |
|---|---|---|---|
| হাইড্রোজেন (H₂) | −285.8 | 2.016 | 141.8 |
| মিথেন (CH₄), প্রাকৃতিক গ্যাস | −890.3 | 16.04 | 55.5 |
| ইথেন (C₂H₆) | −1560.7 | 30.07 | 51.9 |
| ইথিন (C₂H₄) | −1411.2 | 28.05 | 50.3 |
| ইথানল (C₂H₅OH) | −1366.8 | 46.07 | 29.7 |
| গ্লুকোজ (C₆H₁₂O₆) | −2803 | 180.16 | 15.6 |
প্রতি গ্রাম জ্বালানিতে কোনটি বেশি তাপ দেয়: ইথেন (C₂H₆) না ইথিন (C₂H₄)?
ধাপ ৭: এবার নিজে করে দেখো
ধারণাগুলো এখন তোমার জানা। নিচের সিমুলেশনে দুটি অংশ:
- হেসের ধাঁধা (Hess puzzle): ওপরে লক্ষ্য বিক্রিয়া (target reaction), নিচে কয়েকটি জানা সমীকরণের কার্ড। প্রতিটি কার্ড উল্টাও (flip, ΔH × −1) আর গুণ করো (×n) — যোগফলের ঘরে একই পদার্থ দুই পাশে থাকলে নিজে থেকে কাটাকাটি হবে। যোগফল লক্ষ্যের সাথে মিলে গেলে উত্তর পাবে, সঙ্গে প্রকৃত (reference) মান। আটকে গেলে 💡 চাপো।
- জ্বালানির দোকান (fuel shop): জ্বালানি পুড়িয়ে প্রতি গ্রাম, প্রতি মোল আর প্রতি মোল O₂-তে তাপ তুলনা করো।
- চ্যালেঞ্জগুলো একে একে শেষ করো; প্রতিটি ফল পর্যবেক্ষণ খাতায় (observation notebook) জমা হবে।
হেসের চক্র: ধাঁধা ও জ্বালানি
Hess’s law puzzle & fuel valuesমিথেনের গঠন তাপ (ΔfH° of CH₄)
C(graphite) + 2H₂(g) → CH₄(g) ΔH = ?
কার্বন আর হাইড্রোজেন সরাসরি বিক্রিয়া করে মিথেন বানায় না, তাই এর গঠন তাপ সরাসরি মাপা যায় না। তিনটি দহন সমীকরণ (combustion equations) জুড়ে বের করো।
কার্ড উল্টাও (flip) আর গুণ করো (×n) — একই পদার্থ দুই পাশে থাকলে নিজে থেকেই কাটাকাটি (cancel) হবে।
চ্যালেঞ্জ (challenges)
0/6- তিনটি দহন সমীকরণ থেকে মিথেনের গঠন তাপ ΔfH°(CH₄) বের করো
- অ্যাসিটিলিনের গঠন তাপ বের করো — চিহ্নটা লক্ষ করো
- অক্সি-অ্যাসিটিলিন শিখার দহন তাপ বের করো (পানি গ্যাস)
- বন্ধনশক্তির কার্ড দিয়ে C₂H₄ + H₂ → C₂H₆-এর ΔH অনুমান করো, আর মাপা মানের সাথে তুলনা করো
- গ্রাফাইট → হীরার ΔH বের করো
- জ্বালানির দোকানে অন্তত ৫টি জ্বালানি (H₂ সহ) পোড়াও, তারপর “প্রতি গ্রাম” অনুযায়ী সাজিয়ে সেরাটি খোঁজো (0/5)
পর্যবেক্ষণ খাতা (observation notebook)
এখনো কিছু নেই। একটি ধাঁধা মেলাও বা একটি জ্বালানি পোড়াও — ফল এখানে লেখা হবে।
বই পড়ার সময় সাবধান — এই অংশে পাঠ্যবইয়ের অনেক মান আর সমাধান ভুল:
- C–H বন্ধনশক্তি 430.53 kJ/mol (পৃ. 540 ও সারণি 4.7) ভুল — গড় C–H প্রায় 413–416 kJ/mol। বইয়ের নিজের হিসাবেই (পৃ. 541) CH₄ থেকে 415.78 আসে।
- সমাধান 4.72 (ইথেনের গঠন তাপ, পৃ. 542–543): উত্তর “−196.54” দুইভাবে ভুল — যোগে ভুল (343.90 + 2583.18 = 2927.08, বইয়ে 2937.08), আর C–H মান বেশি। সঠিক বন্ধনশক্তি দিলে ≈ −85 kJ/mol, মাপা মান −84.0 kJ/mol (NIST)।
- পানির ধাপে ধাপে বন্ধনশক্তি “503 ও 422” (পৃ. 541) → আসলে 497 ও 428 kJ/mol (গড় 462.5 ঠিক আছে)।
- সারণি 4.7-এর আরও কিছু মান: C=O 724 → 745 (অ্যালডিহাইড/কিটোন), CO₂-তে 799; C≡C 812 → 839; H–F 564 → 570; C–C 343.9 → 348।
- CH₄ + Cl₂ উদাহরণ (পৃ. 542): CH₃Cl-কে “(l)” লেখা — বন্ধনশক্তির হিসাব শুধু গ্যাসের জন্য, হবে CH₃Cl(g)।
- সমাধান 4.78 (অক্সি-অ্যাসিটিলিন, পৃ. 546): ΔfH(C₂H₂) “−227.4” লেখা — চিহ্ন ভুল, আসলে +227.4 kJ/mol (বইয়ের 4.76-এই +231 এসেছে)। সঠিক দহন তাপ −1256 kJ/mol (পানি গ্যাস ধরে; তরল পানি ধরলে −1300), “−801.4” নয়।
- সমাধান 4.79 (চ.বো. 2016 সৃজনশীল, পৃ. 546–547): দেওয়া ডেটা ভুল — “ΔfH(C₂H₄) = −84” আসলে ইথেনের মান (ইথিন +52.4); “ΔfH(H₂O, l) = −220” (আসল −285.8); “ΔcH(C₂H₆) = −1370” আসলে ইথানলের মান (ইথেন −1560.7)। সমীকরণে H₂O(g) লিখে তরলের ডেটা বসানো। সঠিক উত্তর ইথিন 50.3, ইথেন 51.9 kJ/g (“40.78 ও 45.67” নয়); সিদ্ধান্ত (ইথেন ভালো জ্বালানি) অবশ্য ঠিক।
- অনুশীলনী 4.55 (পৃ. 548): ΔfH(H₂O, g) “−220.20” → −241.8 kJ/mol। তাতে CH₄ 50.0 ও C₂H₆ 47.5 kJ/g হয় (বইয়ে 47.43 ও 45.42); সিদ্ধান্ত একই।
- সমাধান 4.81 (পৃ. 551): সমীকরণে 2H₂O(g) লিখে ΔH = −890.3 kJ দেওয়া — −890.3 হলো তরল পানির মান; গ্যাস পানিতে −802.3 kJ।
- অনুশীলনী 4.58(খ), লেড-এসিড ব্যাটারি (পৃ. 552): দেওয়া −775 ও −113 kJ সারণির সাথে মেলে না; NBS সারণির মান (−680.6 ও −182.4) দিয়ে উত্তর প্রায় −316 kJ, “−549” নয়। পদ্ধতি (প্রথমটি − 2 × দ্বিতীয়টি) ঠিক।
- ছোটখাটো: CS₂ তরল, “(s)” নয় (পৃ. 548); 1 kcal = 4.184 kJ (বইয়ে 4.186); প্রমাণ চাপ এখন 1 bar (বইয়ে 1 atm — পার্থক্য খুব সামান্য)। সমাধান 4.74-এর −246.64 kJ বন্ধনশক্তি থেকে অনুমান মাত্র; মাপা মান −241.8 kJ।
ঘরে বসে পরীক্ষা: মোমবাতির জ্বালানি মান
মোম (paraffin wax) একটি হাইড্রোকার্বন জ্বালানি, তাত্ত্বিক মান প্রায় 40–46 kJ/g। দেখো তুমি কত পাও।
- একটি খালি টিনের কৌটায় (can) 100 g (100 mL) কলের পানি নাও, থার্মোমিটার দিয়ে তাপমাত্রা লেখো।
- একটি ছোট মোমবাতি রান্নাঘরের ডিজিটাল দাঁড়িপাল্লায় ওজন করো ()।
- কৌটাটি একটি স্ট্যান্ড বা দুটি ইটের ওপর বসাও, নিচে মোমবাতি জ্বালাও, শিখার ডগা কৌটার তলা ছুঁয়ে থাকবে। পানি নাড়তে থাকো।
- তাপমাত্রা প্রায় 20 °C বাড়লে মোমবাতি নিভিয়ে দাও, সর্বোচ্চ তাপমাত্রা লেখো। ঠান্ডা হলে মোমবাতি আবার ওজন করো ()।
- হিসাব: J; জ্বালানি মান kJ/g।
সাধারণত 10–20 kJ/g-এর মতো আসে — তাত্ত্বিক মানের অর্ধেকেরও কম। কেন? চারপাশের বাতাস আর কৌটা তাপ নিয়ে নেয়, আর কৌটার তলায় কালো ভুসা (soot) জমে — মানে মোম অসম্পূর্ণ দহনে (incomplete combustion) পুড়েছে। খাতায় তাপ হারানোর প্রতিটি পথ লিখে কীভাবে কমানো যায় ভাবো।
নিরাপত্তা: অবশ্যই বড় কারো উপস্থিতিতে করো। কৌটা স্ট্যান্ডে শক্ত করে বসাও, হাতে ধরবে না — গরম কৌটা ধরতে কাপড় বা চিমটা ব্যবহার করো। ঢিলা কাপড় আর লম্বা চুল আগুন থেকে দূরে রাখো, কাছে এক বালতি পানি রাখো। গরম মোম গায়ে পড়লে সঙ্গে সঙ্গে ঠান্ডা পানি দাও।
পরীক্ষার প্রস্তুতি
১. গড় বন্ধনশক্তি ব্যবহার করে CH₄(g) + Cl₂(g) → CH₃Cl(g) + HCl(g) বিক্রিয়ার ΔH নির্ণয় করো। (C–H 413, Cl–Cl 243, C–Cl 339, H–Cl 432 kJ/mol)
ভাঙা বন্ধন: 4টি C–H + 1টি Cl–Cl = kJ
গঠিত বন্ধন: 3টি C–H + 1টি C–Cl + 1টি H–Cl = kJ
kJ — তাপোৎপাদী। (খেয়াল করো: 3টি C–H ভেঙে আবার গড়ে উঠেছে, তাই শুধু 1টি C–H আর Cl–Cl ভেঙে C–Cl আর H–Cl গড়া ধরলেও একই উত্তর।) ΔfH° থেকে মাপা মান −99.6 kJ; পার্থক্য গড় মানের কারণে।
২. নিচের তথ্য থেকে পানিতে O–H বন্ধনের গড় বন্ধনশক্তি নির্ণয় করো: H₂(g) → 2H(g), ΔH = +436 kJ; O₂(g) → 2O(g), ΔH = +498 kJ; H₂(g) + ½O₂(g) → H₂O(g), ΔH = −241.8 kJ।
লক্ষ্য: (2টি O–H ভাঙা)।
শেষ সমীকরণ উল্টাও: , kJ। এর সঙ্গে যোগ করো (+436) আর (+498 ÷ 2 = +249):
kJ, তাই O–H kJ/mol।
৩. 25 °C-এ CO₂(g) ও H₂O(l)-এর গঠন তাপ যথাক্রমে −393.5 ও −285.8 kJ/mol এবং তরল ইথানলের দহন তাপ −1366.8 kJ/mol। ইথানলের প্রমাণ গঠন তাপ নির্ণয় করো।
, kJ
→ kJ/mol (NIST মানের সাথে হুবহু মেলে)।
৪. A, B ও AB₂-এর দহন তাপ যথাক্রমে −394.55, −594.78 ও −1109.17 kJ/mol (A → AO₂, B → BO₂)। AB₂-এর গঠন তাপ নির্ণয় করো।
লক্ষ্য: । নিচের তিনটি যোগ করো:
- : −394.55 kJ
- : 2 × (−594.78) = −1189.56 kJ
- উল্টানো: : +1109.17 kJ
AO₂, BO₂, O₂ কাটাকাটি যায়: kJ/mol।
৫. (সৃজনশীল, চ.বো. 2016 ধরনের) দুই কার্বনবিশিষ্ট হাইড্রোকার্বন P (sp³) ও Q (sp²)। ΔfH°: C₂H₆ −84.0, C₂H₄ +52.4, CO₂ −393.5, H₂O(l) −285.8 kJ/mol। (ক) P-এর দহন তাপ নির্ণয় করো। (খ) প্রতি গ্রামে কোনটি ভালো জ্বালানি?
P = ইথেন (C₂H₆), Q = ইথিন (C₂H₄)।
(ক) : kJ/mol।
(খ) : kJ/mol।
প্রতি গ্রামে: ইথেন kJ/g; ইথিন kJ/g। তাই ইথেন (P) সামান্য ভালো জ্বালানি — এতে হাইড্রোজেনের ভাগ বেশি।
৬. গ্রাফাইট ও হীরার দহন তাপ যথাক্রমে −393.5 ও −395.4 kJ/mol। গ্রাফাইট → হীরা রূপান্তরের ΔH কত? হীরা যদি বেশি শক্তিতে থাকে, তবে গয়নার হীরা গ্রাফাইট হয়ে যায় না কেন?
(−393.5) থেকে উল্টানো (+395.4) যোগ করে: kJ/mol।
হীরা → গ্রাফাইট শক্তির দিক থেকে “নিচে নামা” (−1.9 kJ/mol), কিন্তু এর জন্য হীরার শক্ত ত্রিমাত্রিক জালক (3D network) ভাঙতে হবে — সক্রিয়ণ শক্তি (activation energy) বিশাল, তাই সাধারণ তাপমাত্রায় হার (rate) প্রায় শূন্য। ΔH বলে কোন দিকে শক্তি কম; কত দ্রুত ঘটবে তা বলে না।