পাঠ ৪ / ৮অনুচ্ছেদ ২.২ (গুরুত্ব)
মাইটোসিসের গুরুত্ব, ক্যান্সার ও অ্যাপোপটোসিসWhy mitosis matters: repair, renewal, cancer & apoptosis
হাত কেটে গেলে কয়েক দিনে দাগটা জোড়া লেগে যায়। নতুন কোষ কোথা থেকে এলো — আর ক্ষত ভরে যাওয়ার পর কোষগুলো থামল কেন? নিচের ত্বকের কাটা অংশে দিন বাড়িয়ে নিজে দেখো:
ত্বকের আবরণী কোষের (epithelial cells) স্তরে একটি কাটা। “দিন (day)” স্লাইডার টেনে দেখো কী হয়।
ক্ষত সারায় মাইটোসিস (mitosis), আর ঠিক সময়ে থামায় কোষের ভেতরের কিছু জিন। সেই থামার ব্যবস্থা নষ্ট হলেই ক্যান্সার (cancer)। আর যে কোষের আর দরকার নেই, দেহ তাকে পরিকল্পিতভাবে মেরে ফেলে — অ্যাপোপটোসিস (apoptosis)। এই পাঠে তিনটিই।
এই পাঠে ধাপে ধাপে এগোব:
- মাইটোসিসের গুরুত্ব (significance of mitosis) — বৃদ্ধি, জনন, ক্ষয়পূরণ, স্থির ক্রোমোসোম সংখ্যা
- প্রতিদিনের নবায়ন (cell renewal) — কোন কোষ কত বদলায়
- বিভাজনের নিয়ন্ত্রণ (control) — এক্সেলারেটর আর ব্রেক: প্রোটো-অনকোজিন ও টিউমার দমনকারী জিন
- অনিয়ন্ত্রিত মাইটোসিস — টিউমার, ক্যান্সার, মেটাস্টেসিস
- ক্যান্সারের কারণ ও প্রতিরোধ — কার্সিনোজেন, HPV ও টিকা
- কোষের মৃত্যু — নেক্রোসিস (necrosis) বনাম অ্যাপোপটোসিস
- মাইটোটিক ইনডেক্স (mitotic index) — কত কোষ ভাগ হচ্ছে, গুনে বলা
- অ্যামাইটোসিস বনাম মাইটোসিস — সংক্ষেপে
- এবার নিজে করে দেখো — টিস্যুর ভারসাম্য ল্যাব
এই পাঠের আগে পাঠ ২: কোষচক্র ও এর নিয়ন্ত্রণ আর পাঠ ৩: মাইটোসিসের ধাপ পড়ে নিলে সুবিধা হবে — চেকপয়েন্ট (checkpoint) আর সাইক্লিন-CDK সেখানে আছে।
ধাপ ১: মাইটোসিসের গুরুত্ব
মাইটোসিসে একটি কোষ থেকে হুবহু একই রকম দুটি অপত্য কোষ (daughter cells) হয় — একই সংখ্যা, একই জিন। এই একটি বৈশিষ্ট্য থেকেই এর সব কাজ আসে। বইয়ের এগারোটি পয়েন্ট ছয়টি দলে সাজালে মনে রাখা সহজ:
- দেহের বৃদ্ধি (growth) — একটি জাইগোট (zygote) থেকে প্রায় টি কোষ; উদ্ভিদের মূল ও কাণ্ডের আগার ভাজক টিস্যুতে (meristem) অবিরাম বিভাজন।
- অযৌন জনন (asexual reproduction) — এককোষী ইউক্যারিওট যেমন Chlamydomonas, Amoeba, ইস্ট মাইটোসিসেই বংশবৃদ্ধি করে; উদ্ভিদের অঙ্গজ জননে (vegetative propagation) — আলুর চোখ, কলার তেউড় — নতুন উদ্ভিদ গড়ে মাইটোসিস।
- জননাঙ্গ গঠন — ফুল, পরাগধানী, ডিম্বাশয়ের মতো জনন অঙ্গের দেহ গড়ে মাইটোসিস (ভেতরে গ্যামেট তৈরি হয় মায়োসিসে)।
- ক্ষয়পূরণ ও নবায়ন (repair and renewal) — ক্ষত সারানো, ভাঙা হাড় জোড়া লাগা; ত্বক, অন্ত্রের আবরণী আর রক্তকণিকার নিয়মিত প্রতিস্থাপন।
- স্থির ক্রোমোসোম সংখ্যা ও বংশগত বৈশিষ্ট্য — প্রতিটি দেহকোষে একই 2n আর একই জিন থাকে; তাই একটি জীবের সব দেহকোষ জিনগতভাবে এক।
- নিউক্লিয়াস-সাইটোপ্লাজমের ভারসাম্য (nucleo-cytoplasmic ratio) — কোষ বড় হতে থাকলে একটি নিউক্লিয়াস আর পুরো সাইটোপ্লাজম সামলাতে পারে না; ভাগ হয়ে কোষ আবার ছোট ও কার্যক্ষম হয়।
নিচের কোনটি মাইটোসিসের কাজ নয়?
ধাপ ২: প্রতিদিনের নবায়ন
তুমি স্থির বসে থাকলেও তোমার দেহে কোষ বদলাচ্ছে। একটি হিসাবে (Sender & Milo, 2021) প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দেহে প্রতিদিন প্রায় টি কোষ — ওজনে প্রায় 80 গ্রাম — পুরনো হয়ে সরে যায় আর নতুন আসে। সংখ্যায় এর প্রায় 86 % রক্তকণিকা আর প্রায় 12 % অন্ত্রের আবরণী কোষ:
একটি সূক্ষ্ম কথা: পরিণত লোহিত রক্তকণিকার (RBC) নিউক্লিয়াস নেই, তাই এটি নিজে বিভাজিত হতে পারে না। নতুন RBC আসে লাল অস্থিমজ্জার (red bone marrow) রক্ত-স্টেম কোষের (haematopoietic stem cells) মাইটোসিস থেকে; সেই কোষ পরে পরিণত হওয়ার সময় নিউক্লিয়াস ফেলে দেয়। একইভাবে ত্বক আর অন্ত্রেও বিভাজিত হয় নিচের স্তরের স্টেম কোষ, উপরের পুরনো কোষ ঝরে পড়ে।
মানুষের দেহে প্রতিদিন নতুন লোহিত রক্তকণিকা কীভাবে তৈরি হয়?
ধাপ ৩: বিভাজনের নিয়ন্ত্রণ — এক্সেলারেটর আর ব্রেক
হুকের ত্বক কোষগুলো জানত কখন ভাগ হতে হবে আর কখন থামতে হবে। এই সিদ্ধান্ত আসে তিন জায়গা থেকে:
- বৃদ্ধি-সংকেত (growth factor) — আশপাশের কোষ বা রক্ত থেকে আসা প্রোটিন, যা কোষকে “ভাগ হও” বলে। ক্ষত হলে অণুচক্রিকা (platelet) এমন সংকেত ছাড়ে।
- সংস্পর্শ সংযম (contact inhibition) — চারদিকে প্রতিবেশী কোষ ছুঁয়ে গেলে স্বাভাবিক কোষ ভাগ হওয়া বন্ধ করে।
- চেকপয়েন্ট (checkpoints) — কোষচক্রের G1, G2 আর মেটাফেজে “পাহারা”: DNA ঠিক আছে কি না, ঠিকমতো অনুলিপি হলো কি না দেখে তবেই সামনে যেতে দেয় (পাঠ ২)।
এর পেছনে দুই ধরনের জিন — গাড়ির সাথে তুলনা করলে:
| এক্সেলারেটর (accelerator) | ব্রেক (brake) | |
|---|---|---|
| জিনের নাম | প্রোটো-অনকোজিন (proto-oncogene) | টিউমার দমনকারী জিন (tumour-suppressor gene) |
| স্বাভাবিক কাজ | বৃদ্ধি-সংকেত পেলে বিভাজন চালু করে | বিভাজন থামায়, DNA মেরামত করায়, দরকারে কোষকে মরতে বলে |
| উদাহরণ | RAS, MYC, বৃদ্ধি-সংকেতের গ্রাহক (receptor) | p53, Rb |
| নষ্ট হলে | অতি-সক্রিয় অনকোজিন (oncogene) — এক্সেলারেটর আটকে যায় | ব্রেক কাটা — থামানোর কেউ নেই |
p53-কে বলা হয় “জিনোমের প্রহরী” (guardian of the genome)। DNA ক্ষতিগ্রস্ত হলে p53 কোষচক্র থামায়, মেরামতের সময় দেয়; মেরামত না হলে কোষকে অ্যাপোপটোসিসে পাঠায়। (নামটি এসেছে এর প্রায় 53 kDa ভর থেকে।) Rb প্রোটিন G1 থেকে S-এ যাওয়ার দরজা আটকে রাখে, যতক্ষণ না ঠিক সংকেত আসে। দুটি সুইচ নিজে চালু-বন্ধ করে দেখো:
স্বাভাবিক কোষ: বৃদ্ধি-সংকেত (growth factor) পেলে এক্সেলারেটর চাপে, আর p53/Rb ব্রেক ধরে রাখে। নতুন কোষ ঠিক ততটাই হয় যতটা মরে — সংখ্যা স্থির (steady state)।
p53 প্রোটিনকে জিনোমের প্রহরী বলা হয় কেন?
ধাপ ৪: অনিয়ন্ত্রিত মাইটোসিস — টিউমার ও ক্যান্সার
যখন কোষ নিয়ন্ত্রণ না মেনে ভাগ হতেই থাকে, তখন অতিরিক্ত কোষের পিণ্ড তৈরি হয় — টিউমার (tumour)। এর পেছনে থাকে মিউটেশন (mutation), অর্থাৎ DNA-র স্থায়ী পরিবর্তন:
- প্রোটো-অনকোজিনে মিউটেশন হলে তা অনকোজিন হয় — বৃদ্ধি-সংকেত ছাড়াই “ভাগ হও” বলতে থাকে।
- টিউমার দমনকারী জিন (p53, Rb) নষ্ট হলে ব্রেক থাকে না।
- সাধারণত একটি মিউটেশন যথেষ্ট নয় — কয়েকটি “আঘাত (hits)” বহু বছরে জমতে হয়। এজন্য বেশির ভাগ ক্যান্সার বয়স্কদের বেশি হয়।
- ক্যান্সার কোষ নিজেই বৃদ্ধি-সংকেত বানায়, সংস্পর্শ সংযম মানে না, অ্যাপোপটোসিস এড়ায়, আর বারবার ভাগ হতে পারে।
- মানুষের প্রায় অর্ধেক ক্যান্সারে TP53 জিনে মিউটেশন পাওয়া যায় (Olivier et al., 2010) — সুস্থ কোষের p53 ঠিকই কাজ করে।
| বৈশিষ্ট্য | বিনাইন টিউমার (benign) | ম্যালিগন্যান্ট টিউমার (malignant) = ক্যান্সার |
|---|---|---|
| বৃদ্ধি | সাধারণত ধীর | সাধারণত দ্রুত |
| সীমানা | নির্দিষ্ট জায়গায় থাকে, প্রায়ই আবরণে ঘেরা | চারপাশের টিস্যুতে ঢুকে পড়ে (invasion) |
| ছড়ানো | ছড়ায় না | রক্ত বা লসিকায় (lymph) দূরের অঙ্গে ছড়াতে পারে — মেটাস্টেসিস (metastasis) |
| উদাহরণ | আঁচিল (wart), লাইপোমা (lipoma) | জরায়ুমুখ, মুখগহ্বর, ফুসফুস, স্তনের ক্যান্সার |
ভালো খবর: আমাদের দেহে প্রতিদিন কিছু কোষে মিউটেশন হয়, কিন্তু p53, অ্যাপোপটোসিস আর রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা প্রায় সবগুলোকে সরিয়ে দেয়। আর আগে ধরা পড়লে অনেক ক্যান্সারই চিকিৎসায় সেরে যায়।
অনকোজিন কী?
ধাপ ৫: ক্যান্সারের কারণ ও প্রতিরোধ
যেসব জিনিস DNA-তে মিউটেশন ঘটায় তারা মিউটাজেন (mutagen); যেগুলো ক্যান্সার ঘটাতে পারে তারা কার্সিনোজেন (carcinogen)। অধিকাংশ কার্সিনোজেন মিউটাজেন, তবে সব মিউটাজেন প্রমাণিত কার্সিনোজেন নয়। আন্তর্জাতিক ক্যান্সার গবেষণা সংস্থা (IARC) যেগুলোকে নিশ্চিত মানব-কার্সিনোজেন বলেছে, তার কয়েকটি আমাদের দেশে খুব প্রাসঙ্গিক:
- তামাক — বিড়ি-সিগারেটের ধোঁয়া, আর জর্দা, গুল, সাদাপাতা; সাথে পান-সুপারি — মুখগহ্বরের ক্যান্সারের বড় কারণ।
- আর্সেনিক (arsenic) — কিছু নলকূপের পানিতে; ত্বক, মূত্রথলি ও ফুসফুসের ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়।
- অ্যাফ্লাটক্সিন (aflatoxin) — স্যাঁতসেঁতে জায়গায় রাখা বাদাম, ভুট্টা, মরিচে জন্মানো ছত্রাকের বিষ; যকৃতের ক্যান্সার।
- অতিবেগুনি রশ্মি (UV) — অতিরিক্ত রোদে ত্বকের ক্যান্সার।
- ভাইরাস — হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস (HPV), হেপাটাইটিস B ও C।
HPV কীভাবে ক্যান্সার ঘটায়: উচ্চ-ঝুঁকির HPV (বিশেষত টাইপ 16 ও 18, যারা জরায়ুমুখ ক্যান্সারের প্রায় 70 %-এর জন্য দায়ী — WHO) দুটি প্রোটিন তৈরি করে:
- E6 — p53-কে ধ্বংস করায় (প্রথম ব্রেক নষ্ট)
- E7 — Rb-কে অকেজো করে (দ্বিতীয় ব্রেক নষ্ট)
অর্থাৎ এক ভাইরাসেই দুটি ব্রেক কাটা। তবু বেশির ভাগ HPV সংক্রমণ এক-দুই বছরে নিজে থেকে সেরে যায়; দীর্ঘদিন টিকে থাকলে তবেই ধীরে ধীরে — সাধারণত 15–20 বছরে — ক্যান্সার হতে পারে। HPV টিকা সংক্রমণই ঠেকায়। বাংলাদেশে অক্টোবর 2023 থেকে সরকারি কর্মসূচিতে কিশোরী মেয়েদের বিনামূল্যে HPV টিকা দেওয়া হচ্ছে।
প্রতিরোধ মানে সহজ অভ্যাস: তামাক-জর্দা-পান-সুপারি এড়ানো, আর্সেনিকমুক্ত (সবুজ রং করা) নলকূপের পানি পান, শুকনো জায়গায় খাবার রাখা, HPV ও হেপাটাইটিস B-এর টিকা। আর শরীরে কোনো চাকা, না-সারা ঘা বা অস্বাভাবিক রক্তপাত দেখলে দেরি না করে ডাক্তার দেখাও — ভয় নয়, দ্রুত পরীক্ষাই সবচেয়ে বড় সুরক্ষা।
HPV-র কোন দুটি জিন জরায়ুমুখ ক্যান্সারের সাথে জড়িত, আর তারা কোন প্রোটিনকে অকেজো করে?
ধাপ ৬: কোষের মৃত্যু — নেক্রোসিস বনাম অ্যাপোপটোসিস
কোষ দুইভাবে মরে। নেক্রোসিস (necrosis) দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু — আঘাত, বিষ, রক্ত চলাচল বন্ধ, সংক্রমণ বা পুষ্টির অভাবে। অ্যাপোপটোসিস (apoptosis) পরিকল্পিত, নিজের জিন-নিয়ন্ত্রিত মৃত্যু — প্রোগ্রামড সেল ডেথ (programmed cell death)। নিচে একটি কোষ বেছে মৃত্যুর দুই পথ দেখো:
সুস্থ কোষ (healthy cell): নিউক্লিয়াস, মাইটোকন্ড্রিয়া (mitochondria), অটুট কোষপর্দা।
| বৈশিষ্ট্য | নেক্রোসিস (necrosis) | অ্যাপোপটোসিস (apoptosis) |
|---|---|---|
| কারণ | আঘাত, বিষ, রক্তাভাব, সংক্রমণ | কোষের নিজস্ব সংকেত (যেমন p53), বিকাশের পরিকল্পনা |
| কোষের আকার | ফুলে ওঠে | সংকুচিত হয় |
| কোষপর্দা | ফেটে যায় | অটুট থাকে, বুদবুদ (bleb) হয় |
| নিউক্লিয়াস | গলে মিলিয়ে যায় | ক্রোমাটিন ঘন হয়ে টুকরো হয় |
| শেষ পরিণতি | ভেতরের জিনিস ছড়ায় | অ্যাপোপটোটিক বডি, ফ্যাগোসাইট খেয়ে ফেলে |
| প্রদাহ (inflammation) | হয় | হয় না |
| কতগুলো কোষ | একসাথে অনেক | একটি একটি করে |
প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দেহে প্রতিদিন প্রায় 5–7 × 10¹⁰ (৫০–৭০ বিলিয়ন) কোষ অ্যাপোপটোসিসে মরে — বইয়ের “লক্ষ লক্ষ” নয়, হাজার কোটি। অ্যাপোপটোসিস বিকাশেও লাগে: মাতৃগর্ভে ভ্রূণের হাত প্রথমে প্যাডেলের মতো থাকে, আঙুলের মাঝের কোষগুলো অ্যাপোপটোসিসে মরে আঙুল আলাদা হয়। ব্যাঙাচির লেজ খসে পড়াও অ্যাপোপটোসিস।
প্রায় 6 সপ্তাহের ভ্রূণের হাত একটা প্যাডেলের মতো — আঙুলের রেখা (digit rays) আছে, মাঝে পাতলা ঝিল্লি (web)। স্লাইডার টানো।
নিচের কোনটি অ্যাপোপটোসিসের বৈশিষ্ট্য?
ধাপ ৭: মাইটোটিক ইনডেক্স — গুনে বলো কত দ্রুত বাড়ছে
অণুবীক্ষণ যন্ত্রে একটি টিস্যুর কোষ গুনে দেখা হয় কতগুলো বিভাজনের কোনো দশায় (প্রোফেজ, মেটাফেজ, অ্যানাফেজ, টেলোফেজ) আছে। এই অনুপাতই মাইটোটিক ইনডেক্স (mitotic index, MI):
যেখানে = প্রোফেজ, মেটাফেজ, অ্যানাফেজ ও টেলোফেজ দশার কোষ। উদাহরণ: 1200টি কোষ গুনে 96টি বিভাজনরত পাওয়া গেল, তাহলে
MI বেশি মানে টিস্যুটি দ্রুত বাড়ছে — যেমন মূলের অগ্রভাগ, ক্ষত সারার জায়গা বা টিউমার। ক্যান্সার নির্ণয়ে প্যাথোলজিস্টরা MI দেখে টিউমারের গ্রেড (grade) ঠিক করেন। পেঁয়াজের মূলে নিজে MI মাপবে পাঠ ৮-এর ব্যবহারিকে।
একটি টিস্যুতে 500টি কোষের মধ্যে প্রোফেজে 20, মেটাফেজে 15, অ্যানাফেজে 5, টেলোফেজে 10টি কোষ পাওয়া গেল। MI কত?
ধাপ ৮: অ্যামাইটোসিস বনাম মাইটোসিস — সংক্ষেপে
পুরো তুলনা আর সঠিক উদাহরণ আছে পাঠ ১-এ। পরীক্ষার জন্য মূল পার্থক্য:
| বৈশিষ্ট্য | অ্যামাইটোসিস (amitosis) | মাইটোসিস (mitosis) |
|---|---|---|
| ধরন | প্রত্যক্ষ (direct) | পরোক্ষ (indirect) |
| ক্রোমোসোম ও স্পিন্ডল | দেখা যায় না / তৈরি হয় না | স্পষ্ট ক্রোমোসোম, স্পিন্ডল তৈরি |
| নিউক্লিয়ার পর্দা | অটুট | সাধারণত ভেঙে আবার গড়ে |
| অপত্য কোষ | মাতৃকোষের মতো নাও হতে পারে | হুবহু মাতৃকোষের মতো |
| কোথায় | সিলিয়েটের ম্যাক্রোনিউক্লিয়াস, কিছু বিশেষায়িত কোষ | প্রায় সব ইউক্যারিওটের দেহকোষ (ইস্ট, অ্যামিবাসহ) |
ধাপ ৯: এবার নিজে করে দেখো — টিস্যুর ভারসাম্য ল্যাব
নিচে ত্বকের মতো একটি আবরণী টিস্যু (epithelium), বেসমেন্ট মেমব্রেনের (basement membrane) ওপর বসানো; নিচে রক্তনালি। প্রতিটি বৃত্ত একটি কোষ। নিয়মগুলো এই পাঠের ধারণা থেকে:
- স্বাভাবিক কোষ ভাগ হয় শুধু বৃদ্ধি-সংকেত পেলে আর পাশে ফাঁকা জায়গা থাকলে (সংস্পর্শ সংযম)।
- পুরনো কোষ মাঝে মাঝে অ্যাপোপটোসিসে সরে যায় — তাই স্বাভাবিক টিস্যুতেও অল্প কয়েকটি কোষ সবসময় বিভাজনরত।
- কার্সিনোজেন DNA ক্ষতি করে (✕); কাজ করা p53 সেই কোষ থামায় ও সরায়। ক্ষতিগ্রস্ত কোষ ভাগ হলে নতুন মিউটেশন স্থায়ী হতে পারে।
- সাদা বর্ডারের কোষটি একটি ক্লোন (clone) — বোতাম দিয়ে এর আর এর বংশধরদের মিউটেশন দাও।
টিস্যুতে ছুঁয়ে আঁচড় দাও, ▶ চালাও, তারপর চ্যালেঞ্জগুলো শেষ করো। প্রতিটি পরীক্ষা শেষে “খাতায় লেখো” চাপো:
টিস্যুর ভারসাম্য ল্যাব (tissue balance lab)
Renewal, contact inhibition, oncogenes, p53, apoptosis, HPV and the mitotic indexএকটি ক্লোনে মিউটেশন (mutations in one clone)
পরিবেশ (environment)
নমুনা গোনো: 100টি কোষ (count 100 cells)
টিস্যুর যেকোনো জায়গায় ছুঁয়ে আঁচড় দাও, বা নিচের বোতামগুলো দিয়ে পরীক্ষা শুরু করো।
ধারণাগত মডেল (conceptual model): প্রতি ধাপে বিভাজন, মৃত্যু ও DNA-ক্ষতির সম্ভাবনাগুলো উদাহরণ মাত্র (illustrative), মাপা হার নয়; এক ধাপ কোনো নির্দিষ্ট দিন নয়।
চ্যালেঞ্জ (challenges)
0/6- আঁচড় সারাও: কখন বিভাজন থামে? সারার পর “স্বাভাবিক কোষ” থেকে MI মাপো।
- দেখাও: একটি মিউটেশনে টিউমার হয় না (80 ধাপ চালাও), কিন্তু দুটিতে হয় (কার্সিনোজেন 0, HPV ছাড়া)। (0/2)
- কার্সিনোজেন ≥ 50 % রেখে অ্যাপোপটোসিস বন্ধ করো, 40 ধাপ চালাও: কতটি ক্ষতিগ্রস্ত (✕) কোষ বেঁচে থাকে? (0/40)
- টিউমার তৈরি করে “স্বাভাবিক” আর “পরিবর্তিত” কোষ থেকে 100টি করে নমুনা নিয়ে MI তুলনা করো।
- HPV সংক্রমণ দিয়ে 60 ধাপ চালাও; তারপর নতুন টিস্যুতে টিকা চালু করে আবার সংক্রমণের চেষ্টা করো। (0/60)
- টিউমারকে মেটাস্টেসিস করাও — কোন বাড়তি পরিবর্তন লাগল?
পর্যবেক্ষণ খাতা (observation notebook)
এখনো কিছু লেখা হয়নি। কোনো পরীক্ষা চালিয়ে “খাতায় লেখো” চাপো।
বই পড়ার সময় সাবধান — পাঠ্যবইয়ের এই অংশে কিছু ভুল আছে:
- পৃ. 87: “এ ভাইরাসের B₆ ও B₇ জিন দুটি ক্যান্সার তৈরি করে” — HPV-র ক্যান্সার-জিন দুটি হলো E6 ও E7 (E6 p53 ধ্বংস করায়, E7 Rb অকেজো করে)। (উৎস: IARC Monographs 100B; NCBI Bookshelf; Campbell Biology)
- পৃ. 87: “মানুষের প্রায় অর্ধেক সংখ্যক কোষেই defective P⁵³ আছে” — আসলে মানুষের প্রায় অর্ধেক ক্যান্সারে TP53 মিউটেশন থাকে; সুস্থ কোষের p53 ঠিকই কাজ করে। আর নামটি p53 (ছোট হাতের p, 53 ওপরে-লেখা নয়)। (Olivier et al., 2010)
- পৃ. 87, পৃ. 100 (সারসংক্ষেপ 15): “কোষ চক্র বিনষ্টকারী জিন হলো Oncogene” — অনকোজিন কোষচক্র ধ্বংস করে না, উল্টো বিভাজন চালু রাখে: এটি মিউটেশনে অতি-সক্রিয় প্রোটো-অনকোজিন (আটকে যাওয়া এক্সেলারেটর)। p53 বা Rb-এর মতো যেসব জিন নষ্ট হলে ব্রেক থাকে না, সেগুলো টিউমার দমনকারী জিন। বোর্ডের উত্তর বইয়ের বাক্যটি, তবে সংজ্ঞায় সঠিকটি লিখলে আরও ভালো।
- পৃ. 87: “মিউটাজেনিক পদার্থই Carcinogenic হয়” — অধিকাংশ কার্সিনোজেন মিউটাজেন, কিন্তু সব মিউটাজেন প্রমাণিত কার্সিনোজেন নয়, আর কিছু কার্সিনোজেন (যেমন কিছু হরমোন, অ্যাসবেস্টস) মূলত অন্য পথে কাজ করে। (IARC Preamble)
- পৃ. 87, পয়েন্ট ৯: লোহিত রক্তকণিকা মাইটোসিসে পুনরুৎপাদিত হয় — পরিণত RBC-র নিউক্লিয়াস নেই, ভাগ হতে পারে না; নতুন RBC আসে অস্থিমজ্জার স্টেম কোষের মাইটোসিস থেকে।
- পৃ. 87–88: “প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ কোষের মৃত্যু ঘটে” — সংখ্যাটি অনেক বড়: প্রতিদিন প্রায় টি কোষ বদলায়, শুধু অ্যাপোপটোসিসেই 5–7 × 10¹⁰টি। বেশির ভাগ রক্তকণিকা ও অন্ত্রের কোষ — বইয়ের এই অংশটি ঠিক।
- পৃ. 88: নেক্রোসিসের কারণ শুধু “পুষ্টির অভাব বা বিষাক্ত দ্রব্য” নয় — আঘাত, রক্ত চলাচল বন্ধ, সংক্রমণও; আর নেক্রোসিসে প্রদাহ হয়, অ্যাপোপটোসিসে হয় না।
ঘরে বসে: পরীক্ষা নয়, একটি সচেতনতার কাজ
কোষ বিভাজন বা ক্যান্সার ঘরে বসে দেখার কোনো নিরাপদ, সৎ পরীক্ষা নেই — তাই কিছু বানিয়ে দিচ্ছি না। বরং একটি আসল কাজ করো: তোমাদের বাড়ি বা পাড়ার নলকূপের আর্সেনিক পরীক্ষা হয়েছে কি না খোঁজ নাও। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (DPHE) পরীক্ষা করে নলকূপের মুখ সবুজ (নিরাপদ) বা লাল (আর্সেনিক বেশি — খাওয়া ও রান্নায় ব্যবহার নিষেধ) রং করে দেয়। রং না থাকলে ইউনিয়ন পরিষদ বা উপজেলা জনস্বাস্থ্য অফিসে পরীক্ষার কথা জিজ্ঞেস করো। পরিবারের কেউ পান-জর্দা খেলে এই পাঠের তথ্যটা শান্তভাবে জানাও।
মনে রাখো: এখানে কোনো চিকিৎসা-পরামর্শ নেই। শরীরে চাকা, না-সারা ঘা, অস্বাভাবিক রক্তপাত বা দীর্ঘদিনের কাশির মতো কিছু দেখলে নিজে অনুমান না করে ডাক্তার দেখাও।
পরীক্ষার প্রস্তুতি
১. (জ্ঞানমূলক ক) সংজ্ঞা দাও: অ্যাপোপটোসিস, নেক্রোসিস, মেটাস্টেসিস, অনকোজিন, মাইটোটিক ইনডেক্স।
উত্তর দেখো
- অ্যাপোপটোসিস: জিন-নিয়ন্ত্রিত, পরিকল্পিত কোষমৃত্যু, যেখানে কোষ সংকুচিত হয়ে অ্যাপোপটোটিক বডিতে ভাগ হয় এবং ফ্যাগোসাইট সেগুলো খেয়ে ফেলে; প্রদাহ হয় না।
- নেক্রোসিস: আঘাত, বিষ, রক্তাভাব বা সংক্রমণে কোষের অনিয়ন্ত্রিত মৃত্যু, যেখানে কোষ ফুলে ফেটে যায় ও প্রদাহ হয়।
- মেটাস্টেসিস: ম্যালিগন্যান্ট টিউমারের কোষ রক্ত বা লসিকার মাধ্যমে দেহের দূরের অঙ্গে ছড়িয়ে নতুন টিউমার গড়া।
- অনকোজিন: মিউটেশনে অতি-সক্রিয় হয়ে যাওয়া প্রোটো-অনকোজিন, যা অনিয়ন্ত্রিত কোষ বিভাজন ঘটায়।
- মাইটোটিক ইনডেক্স: কোনো টিস্যুর গোনা মোট কোষের মধ্যে বিভাজনরত (প্রোফেজ থেকে টেলোফেজ) কোষের শতকরা হার।
২. (জ্ঞানমূলক/MCQ) কোন প্রোটিনকে “জিনোমের প্রহরী” বলা হয়? (ক) Rb (খ) সাইক্লিন (গ) p53 (ঘ) CDK
উত্তর দেখো
(গ) p53। DNA ক্ষতিগ্রস্ত হলে p53 কোষচক্র থামায়, মেরামত করায়, না পারলে অ্যাপোপটোসিস ঘটায়। মানুষের প্রায় অর্ধেক ক্যান্সারে TP53 মিউটেশন পাওয়া যায়।
৩. (প্রয়োগমূলক গ — গাণিতিক) একটি টিউমারের বায়োপসিতে (biopsy) 1200টি কোষ গুনে 96টি বিভাজনরত পাওয়া গেল। পাশের সুস্থ টিস্যুতে 1500টি কোষে 30টি বিভাজনরত। দুটির MI নির্ণয় করো এবং তুলনা করো।
উত্তর দেখো
টিউমার:
সুস্থ টিস্যু:
টিউমারের MI সুস্থ টিস্যুর গুণ — অর্থাৎ টিউমারে কোষ অনেক বেশি হারে বিভাজিত হচ্ছে; নিয়ন্ত্রণহীন মাইটোসিসের লক্ষণ।
৪. (অনুধাবনমূলক খ) মাইটোসিসের যেকোনো পাঁচটি গুরুত্ব লেখো।
উত্তর দেখো
- জাইগোট থেকে বহুকোষী দেহের বৃদ্ধি ঘটায়।
- এককোষী ইউক্যারিওটের অযৌন জনন ও উদ্ভিদের অঙ্গজ জনন ঘটায়।
- ক্ষতস্থান পূরণ ও পুরনো কোষের (ত্বক, অন্ত্রের আবরণী, রক্তকণিকা — স্টেম কোষের মাধ্যমে) নবায়ন করে।
- প্রতিটি দেহকোষে ক্রোমোসোম সংখ্যা ও বংশগত বৈশিষ্ট্য অপরিবর্তিত রাখে।
- কোষের নিউক্লিয়াস ও সাইটোপ্লাজমের ভারসাম্য রক্ষা করে।
৫. (উচ্চতর দক্ষতা ঘ) “কোষচক্রের নিয়ন্ত্রণ নষ্ট হলে টিউমার সৃষ্টি হয়” — p53 ও সাইক্লিন-CDK-এর ভূমিকার আলোকে বিশ্লেষণ করো।
উত্তর দেখো
স্বাভাবিক কোষে বৃদ্ধি-সংকেত এলে সাইক্লিন তৈরি হয়ে CDK-কে সক্রিয় করে, আর সাইক্লিন-CDK কোষকে G1 থেকে S-এ ও G2 থেকে M-এ নিয়ে যায় (এক্সেলারেটর)। অন্যদিকে Rb G1-এ দরজা আটকে রাখে, আর DNA ক্ষতিগ্রস্ত হলে p53 সক্রিয় হয়ে CDK-বাধাদানকারী প্রোটিন তৈরি করায় — কোষচক্র থামে, DNA মেরামত হয়, না হলে অ্যাপোপটোসিস (ব্রেক)।
যদি প্রোটো-অনকোজিনে মিউটেশন হয়ে অনকোজিন তৈরি হয়, সংকেত ছাড়াই সাইক্লিন-CDK সক্রিয় থাকে — কোষ বারবার বিভাজিত হয়। আবার p53 নষ্ট হলে ক্ষতিগ্রস্ত কোষ থামে না, মরেও না; ফলে নতুন মিউটেশন জমতে থাকে। এক্সেলারেটর আটকে যাওয়া আর ব্রেক নষ্ট হওয়া — এমন কয়েকটি মিউটেশন একসাথে হলে কোষ সংস্পর্শ সংযমও মানে না, অনিয়ন্ত্রিতভাবে ভাগ হয়ে পিণ্ড বা টিউমার তৈরি করে। এর কোষ আক্রমণ ক্ষমতা পেলে বেসমেন্ট মেমব্রেন ভেদ করে মেটাস্টেসিস ঘটায়। তাই বক্তব্যটি যথার্থ: কোষচক্রের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাই টিউমারের বিরুদ্ধে দেহের মূল সুরক্ষা।
৬. (MCQ) HPV-র E6 ও E7 প্রোটিন যথাক্রমে কোনটিকে অকেজো করে? (ক) Rb, p53 (খ) p53, Rb (গ) সাইক্লিন, CDK (ঘ) p53, সাইক্লিন
উত্তর দেখো
(খ) p53, Rb। E6 p53-কে ধ্বংস করায়, E7 Rb-কে অকেজো করে — দুটি টিউমার দমনকারী প্রোটিন একসাথে নষ্ট। HPV টিকা এই সংক্রমণ ঠেকায়।