পাঠ ৩ / ১৩অনুচ্ছেদ ৪.৩.২–৪.৩.৫
সংঘর্ষ তত্ত্ব, সক্রিয়ণ শক্তি ও আরহেনিয়াস সমীকরণCollision theory, activation energy & the Arrhenius equation
দুধ ফ্রিজের বাইরে রাখলে এক দিনেই টক হয়ে যায়, ফ্রিজে থাকে কয়েক দিন। তাপমাত্রা (temperature) মাত্র 25–30 °C কমেছে, অথচ নষ্ট হওয়ার বিক্রিয়ার (reaction) গতি কমেছে কয়েক গুণ। নিচের বাক্সে গ্যাসের অণু (molecule) ছোটাছুটি করছে আর একে অপরকে ধাক্কা দিচ্ছে। নিজে বাক্সটি গরম করে দেখো:
মাপ বোঝার সুবিধার জন্য এই বাক্সে সক্রিয়ণ শক্তি (activation energy) ধরা হয়েছে মাত্র 10 kJ/mol (illustrative)। আসল বিক্রিয়ায় এটি সাধারণত 50–200 kJ/mol — তখন ঘরের তাপমাত্রায় প্রতি 10⁹টি সংঘর্ষে মাত্র কয়েকটি সফল হয়। “হিসাব” অংশটি তত্ত্ব (theory) থেকে, বাক্সের সংখ্যাগুলো সরাসরি গোনা।
- কয়েক সেকেন্ড দেখো: বেশিরভাগ সংঘর্ষ (collision) ধূসর — অণুগুলো (molecules) ধাক্কা খেয়ে ফিরে যায়, বিক্রিয়া (reaction) হয় না।
- তাপমাত্রা (temperature) 450 K-এর বেশি করো। কোন রঙের ঝলক বেশি বাড়ল?
- “310 K” বোতাম চাপো — মাত্র 10 K বাড়লে কী হয়, নিচের হিসাবে দেখো।
তাপমাত্রা 300 K থেকে 310 K করলে তাপমাত্রা বাড়ে মাত্র 3%, অণুর ধাক্কা বা সংঘর্ষও (collision) বাড়ে মাত্র ~2%। তাহলে সফল সংঘর্ষ — যেগুলোতে সত্যিই বিক্রিয়া হয় — এত বেশি বাড়ে কেন? আসল বিক্রিয়ায় সেটি প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়!
এই পাঠ শেষে তুমি নিজেই এর উত্তর দিতে পারবে, আর মাপা হার (rate) থেকে বিক্রিয়ার “শক্তি-বাধা” হিসাব করতে পারবে। ধাপে ধাপে এগোব:
- পূর্বজ্ঞান — তাপমাত্রা মানে অণুর গতিশক্তি (kinetic energy), আর শক্তি বণ্টন (energy distribution)
- বিক্রিয়ার হারের ওপর প্রভাব বিস্তারকারী নিয়ামক (factors affecting rate)
- সংঘর্ষ তত্ত্ব (collision theory) — সফল সংঘর্ষের তিন শর্ত
- সক্রিয়ণ শক্তি (activation energy) ও শক্তি-লেখ (energy profile)
- অবস্থান্তর অবস্থা তত্ত্ব (transition state theory)
- আরহেনিয়াস সমীকরণ (Arrhenius equation)
- এবার নিজে করে দেখো — সংঘর্ষের বাক্স (collision box) সিমুলেশন
ধাপ ১: তাপমাত্রা মানে অণুর গতিশক্তি
গ্যাস বা দ্রবণের (solution) অণুগুলো সব সময় ছোটাছুটি করে। চলন্ত কিছুর যে শক্তি, তাকে বলে গতিশক্তি (kinetic energy, )। তাপমাত্রা আসলে এই গতিশক্তিরই মাপ — এক মোল (mole) গ্যাসের অণুর গড় গতিশক্তি:
এখানে কেলভিন (kelvin, K) এককে: । 300 K-এ গড় গতিশক্তি মাত্র 3.7 kJ/mol।
কিন্তু সব অণুর শক্তি সমান নয়। প্রতি মুহূর্তে ধাক্কা খেয়ে কেউ ধীর হয়, কেউ দ্রুত। কত অণুর কত শক্তি — এই হিসাবকে বলে ম্যাক্সওয়েল-বোল্টজম্যান বণ্টন (Maxwell–Boltzmann distribution)। বেশিরভাগ অণুর শক্তি গড়ের কাছাকাছি, আর খুব অল্প কিছু অণুর শক্তি অনেক বেশি — বক্ররেখার লম্বা “লেজ” (tail)। নিচে তাপমাত্রা বদলাও আর কমলা হাতলটি টেনে একটি শক্তি-সীমা (Ea) বসাও:
ম্যাক্সওয়েল-বোল্টজম্যান শক্তি বণ্টন (Maxwell–Boltzmann energy distribution) — গ্যাসের অণুর গতিশক্তি (kinetic energy)
বক্ররেখার নিচের মোট ক্ষেত্রফল (area) = 1 = সব অণু। T বাড়লে চূড়া নিচু হয়ে ডানে সরে, লেজ লম্বা হয়। দুটি সংখ্যা সামান্য আলাদা: প্রথমটি সব অণুর মধ্যে, দ্বিতীয়টি সংঘর্ষের মধ্যে (কেন্দ্র বরাবর শক্তি, energy along the line of centres) — সংঘর্ষ তত্ত্বের সূত্রে দ্বিতীয়টি বসে।
- কমলা হাতলটি (handle) টেনে সক্রিয়ণ শক্তি (Ea) ডানে-বাঁয়ে সরাও। Ea যত ডানে, কমলা অংশ তত ছোট।
- “এই বক্ররেখা রাখো” চেপে বর্তমান অবস্থা মনে রাখো, তারপর T মাত্র 10–20 K বাড়াও। কমলা অংশ কত গুণ হলো?
দুটি জিনিস লক্ষ করো: (১) T বাড়লে চূড়া নিচু হয়ে ডানে সরে যায়, কারণ মোট ক্ষেত্রফল (= সব অণু) একই থাকে; (২) গড়ের অনেক ডানে কোনো সীমা থাকলে, T সামান্য বাড়ালেই সেই সীমার ওপরের অণু কয়েক গুণ হয়ে যায়। এই দ্বিতীয় কথাটিই পুরো পাঠের চাবি।
তাপমাত্রা 300 K থেকে 310 K করলে কোনটি সবচেয়ে বেশি অনুপাতে বাড়ে?
ধাপ ২: বিক্রিয়ার হারের ওপর প্রভাব বিস্তারকারী নিয়ামক
বিক্রিয়ার হার (rate of reaction) মানে প্রতি একক সময়ে বিক্রিয়ক (reactant) বা উৎপাদের (product) ঘনমাত্রার পরিবর্তন — এর সংজ্ঞা আর হার সূত্র (rate law) আগের পাঠ বিক্রিয়ার হার ও ক্রম-এ আছে। হার যেসব জিনিসের ওপর নির্ভর করে:
- ঘনমাত্রা (concentration): বিক্রিয়ক বেশি ঘন হলে একই আয়তনে অণু বেশি, তাই সংঘর্ষও বেশি — হার বাড়ে।
- চাপ (pressure), গ্যাসের ক্ষেত্রে: চাপ বাড়ালে গ্যাসের আয়তন কমে, ঘনমাত্রা বাড়ে — ফল একই।
- তাপমাত্রা (temperature): সবচেয়ে নাটকীয় প্রভাব — এই পাঠের মূল বিষয়।
- পৃষ্ঠতলের ক্ষেত্রফল (surface area): গুঁড়া মার্বেল (CaCO₃) টুকরার চেয়ে অনেক দ্রুত HCl-এ বিক্রিয়া করে, কারণ বেশি অণু উন্মুক্ত থাকে।
- প্রভাবক (catalyst): বিক্রিয়ার জন্য কম শক্তির নতুন পথ তৈরি করে (পরের পাঠ প্রভাবক ও এনজাইম)।
- আলো (light): কিছু বিক্রিয়া আলোর শক্তিতে চলে, যেমন সূর্যালোকে H₂ + Cl₂ বিস্ফোরণ, বা ফটোগ্রাফিক ফিল্মে AgBr-এর বিয়োজন।
পাঠ্যবইয়ের একটি চেনা পরীক্ষা: সোডিয়াম থায়োসালফেট (Na₂S₂O₃) দ্রবণে HCl ঢাললে ধীরে ধীরে হলুদ-সাদা সালফার (S) জমে দ্রবণ ঘোলা হয়। ফ্লাস্কের নিচে কাগজে আঁকা ✕ চিহ্ন যখন আর দেখা যায় না, ঘড়ি থামাও। সময় যত কম, হার তত বেশি (হার ∝ 1/সময়)। নিজে ঘনমাত্রা আর তাপমাত্রা বদলে মাপো:
সোডিয়াম থায়োসালফেট (sodium thiosulfate) + HCl: Na₂S₂O₃ + 2HCl → S↓ + 2NaCl + H₂O + SO₂ — ফ্লাস্কের নিচের কাগজে আঁকা ক্রস (✕) কখন ঢেকে যায়?
25 °C-এর সময়গুলো পাঠ্যবইয়ের সারণি ৪.২ থেকে (শ্রেণিকক্ষের আনুমানিক মান, illustrative)। অন্য তাপমাত্রার সময় হিসাব করা হয়েছে Ea ≈ 55 kJ/mol ধরে (আনুমানিক)।
- একই তাপমাত্রায় দুটি ভিন্ন ঘনমাত্রা (concentration) দিয়ে সময় মাপো। ঘনমাত্রা দ্বিগুণ করলে সময়ের কী হয়?
- একই ঘনমাত্রায় তাপমাত্রা 10 °C বাড়িয়ে আবার মাপো। সময় কতটা কমল?
| [Na₂S₂O₃] (mol/L) | 0.01 | 0.02 | 0.04 | 0.08 | 0.1 |
|---|---|---|---|---|---|
| ✕ ঢাকতে সময় (s) | 98 | 51 | 24 | 12 | 10 |
| হার ∝ 1/t (s⁻¹) | 0.010 | 0.020 | 0.042 | 0.083 | 0.100 |
(সারণি ৪.২, পাঠ্যবই — শ্রেণিকক্ষের আনুমানিক মান।) ঘনমাত্রা দ্বিগুণ করলে সময় প্রায় অর্ধেক, অর্থাৎ হার প্রায় দ্বিগুণ। আর তাপমাত্রা মাত্র 10 °C বাড়ালেও সময় প্রায় অর্ধেক হয়ে যায়!
একই ভরের মার্বেলের একটি টুকরা আর মার্বেল গুঁড়া সমান HCl-এ দিলে গুঁড়ায় বিক্রিয়া দ্রুত হয় কেন?
ধাপ ৩: সংঘর্ষ তত্ত্ব — সফল সংঘর্ষের তিন শর্ত
কেন এসব নিয়ামক হার বদলায়? উত্তর দেয় সংঘর্ষ তত্ত্ব (collision theory)। দুটি অণু বিক্রিয়া করতে হলে পুরোনো বন্ধন (bond) ভাঙতে হবে আর নতুন বন্ধন গড়তে হবে। এর জন্য তিনটি শর্ত পূরণ হতে হয়:
- সংঘর্ষ হতে হবে — বিক্রিয়ক কণাগুলোকে (অণু, পরমাণু বা আয়ন) একে অপরকে ধাক্কা দিতে হবে।
- যথেষ্ট শক্তি থাকতে হবে — সংঘর্ষের শক্তি একটি ন্যূনতম মান, অর্থাৎ সক্রিয়ণ শক্তি (activation energy, )-এর সমান বা বেশি হতে হবে। নইলে অণুগুলো শুধু ধাক্কা খেয়ে ফিরে যায় (ব্যর্থ সংঘর্ষ, ineffective collision)।
- সঠিক দিক থেকে (orientation) হতে হবে — অণুর যে অংশে বিক্রিয়া হবে, ঠিক সেই অংশে আঘাত লাগতে হবে।
তিনটি শর্তই পূরণ হলে তাকে বলে কার্যকর বা সফল সংঘর্ষ (effective collision)। তৃতীয় শর্তের বইয়ের উদাহরণ: ক্লোরোফর্ম (CHCl₃) অণুর এক দিকে ছোট H পরমাণু, অন্য তিন দিকে তিনটি বড় Cl পরমাণু। আলোতে তৈরি ক্লোরিন মুক্তমূলক (free radical, Cl·) শুধু H-এর দিক থেকে আঘাত করলেই H টেনে নিয়ে HCl বানাতে পারে:
সঠিক দিকে সংঘর্ষ (orientation): CHCl₃ + Cl· → CCl₃· + HCl
Cl· কোন দিক থেকে আসবে ঠিক করো (চারপাশে টেনে বা স্লাইডারে), গতি বেছে নাও, তারপর “ছোড়ো” চাপো।
- Cl পরমাণুর দিক থেকে দ্রুত গতিতে ছোড়ো।
- H-এর দিক থেকে দ্রুত গতিতে ছোড়ো।
- H-এর দিক থেকেই, কিন্তু ধীর গতিতে ছোড়ো।
- “এলোমেলো দিক” বোতামে অন্তত ১০ বার ছোড়ো — কত ভাগ সফল হয়?
বড় পরমাণু বা গ্রুপ আক্রমণের পথ আড়াল করে রাখাকে বলে স্থানিক বাধা (steric hindrance)। সব দিকের সংঘর্ষের মধ্যে যে ভগ্নাংশ ঠিক দিক থেকে হয়, তাকে বলে স্থানিক উৎপাদক (steric factor, )। তিন শর্ত একসাথে লিখলে হার ধ্রুবক (rate constant):
- = সংঘর্ষ হার (collision frequency) — প্রতি সেকেন্ডে কতগুলো সংঘর্ষ (শর্ত ১)। এটি -এর সমানুপাতিক, তাই তাপমাত্রার সঙ্গে খুব ধীরে বাড়ে।
- = সংঘর্ষগুলোর মধ্যে যে ভগ্নাংশের শক্তি বা বেশি (শর্ত ২)। ধাপ ১-এর চিত্রের কমলা লেজ এটিই।
- = ঠিক দিকের ভগ্নাংশ (শর্ত ৩), 0 থেকে 1-এর মধ্যে।
তাপমাত্রা বাড়ালে বিক্রিয়ার হার বাড়ার প্রধান কারণ কোনটি?
ধাপ ৪: সক্রিয়ণ শক্তি ও শক্তি-লেখ
সক্রিয়ণ শক্তি (activation energy, ): বিক্রিয়ক অণুকে উৎপাদে পরিণত হতে হলে তাদের গড় শক্তির ওপরে যে ন্যূনতম বাড়তি শক্তি অর্জন করতে হয়, সেটিই সক্রিয়ণ শক্তি। যেসব অণু এই শক্তি পায়, তাদের বলে সক্রিয় অণু (activated molecules)। পাহাড় পেরিয়ে অন্য পাশের গ্রামে যাওয়ার মতো — গ্রাম নিচে হলেও আগে পাহাড়ে উঠতে হবে।
বিক্রিয়ার অগ্রগতির (reaction progress) সঙ্গে স্থিতিশক্তি (potential energy) কীভাবে বদলায়, তার চিত্রকে বলে শক্তি-লেখ (energy profile)। নিজে বানাও:
শক্তি-লেখ (energy profile) বানাও — কমলা হাতলগুলো (handles) ওপর-নিচে টানো
যাচাই: Ea(fwd) − Ea(rev) = 100 − 170 = -70 = ΔH। চূড়া সরালে Ea বদলায়, কিন্তু ΔH নয় — ΔH শুধু শুরু আর শেষের স্তরের ওপর নির্ভর করে।
- একটি তাপোৎপাদী (exothermic) বিক্রিয়া বানাও: উৎপাদের (products) স্তর বিক্রিয়কের (reactants) নিচে।
- এবার তাপহারী (endothermic) বানাও। Ea(fwd) কি কখনো ΔH-এর চেয়ে ছোট করা যায়?
- শুধু চূড়া (hump) ওঠা-নামা করাও: ΔH একই থাকে, অথচ Ea অন্তত 40 kJ/mol বদলায়।
চিত্র থেকে তিনটি সম্পর্ক:
এখানে = বিক্রিয়কের, = উৎপাদের, = চূড়ার (সক্রিয়ণকৃত জটিলের) শক্তি।
- তাপোৎপাদী (exothermic): উৎপাদ বিক্রিয়কের নিচে, — বাড়তি শক্তি তাপ হিসেবে বের হয়।
- তাপহারী (endothermic): উৎপাদ ওপরে, — পরিবেশ থেকে তাপ শোষিত হয়। এখানে হতেই হবে, কারণ চূড়া উৎপাদের নিচে থাকতে পারে না।
- সক্রিয়ণ শক্তির ওপর নির্ভর করে না। চূড়া ওঠা-নামা করালে বদলায়, নয়। তাই একটি তাপহারী বিক্রিয়াও কোনো তাপোৎপাদী বিক্রিয়ার চেয়ে দ্রুত হতে পারে, যদি তার কম হয় — হার ঠিক করে আর , -এর চিহ্ন নয়।
একটি বিক্রিয়ায় Ea(fwd) = 120 kJ/mol এবং ΔH = −40 kJ/mol। বিপরীত বিক্রিয়ার সক্রিয়ণ শক্তি কত?
ধাপ ৫: অবস্থান্তর অবস্থা তত্ত্ব
শক্তি-লেখের চূড়ায় ঠিক কী থাকে? ধরো A অণু B–C অণুর দিকে আসছে। যত কাছে আসে, A ও B-এর মধ্যে নতুন বন্ধন গড়তে শুরু করে আর B–C বন্ধন দুর্বল হয়। চূড়ায় এমন এক অবস্থা আসে যেখানে পুরোনো বন্ধন আধা-ভাঙা, নতুন বন্ধন আধা-গড়া:
এই সর্বোচ্চ শক্তির, অত্যন্ত ক্ষণস্থায়ী অবস্থাকে বলে অবস্থান্তর অবস্থা (transition state), আর সেই মুহূর্তের পরমাণু-গুচ্ছকে বলে সক্রিয়ণকৃত জটিল (activated complex)। বিক্রিয়কের শক্তি আর সক্রিয়ণকৃত জটিলের শক্তির পার্থক্যই সক্রিয়ণ শক্তি। স্লাইডার টেনে পাহাড় পার করাও:
অবস্থান্তর অবস্থা (transition state): A + B–C → A···B···C → A–B + C
বিক্রিয়ক (reactants): A আর B–C অণু আলাদা। A এগিয়ে আসছে।
- স্লাইডার টেনে পাহাড়ের চূড়ায় থামো। A···B···C-তে কোন বন্ধনগুলো ভাঙা/গড়ার মাঝপথে?
- শেষ পর্যন্ত টেনে উৎপাদে পৌঁছাও।
সক্রিয়ণকৃত জটিল কোনো আলাদা যৌগ (compound) নয় যাকে বোতলে ভরা যায় — এর আয়ু একটি আণবিক কম্পনের (molecular vibration) সময়ের মতো, ~10⁻¹³ s। এটি হয় উৎপাদে ভেঙে যায়, নয়তো আবার বিক্রিয়কে ফিরে যায়।
সক্রিয়ণকৃত জটিল (activated complex) সম্পর্কে কোনটি সঠিক?
ধাপ ৬: আরহেনিয়াস সমীকরণ
১৮৮৯ সালে সুইডিশ বিজ্ঞানী স্যভান্তে আরহেনিয়াস (Svante Arrhenius) পরীক্ষালব্ধ হার ধ্রুবক থেকে এই সমীকরণটি দেন:
- = পূর্ব-সূচকীয় উৎপাদক (pre-exponential factor) বা কম্পাঙ্ক উৎপাদক (frequency factor) — সংঘর্ষ তত্ত্বে , একক -এর এককের মতোই।
- = যথেষ্ট শক্তির সংঘর্ষের ভগ্নাংশ।
- , তাই বসাতে হয় J/mol-এ, আর কেলভিনে।
সংখ্যায় দেখো। kJ/mol হলে যথেষ্ট শক্তির সংঘর্ষের ভগ্নাংশ:
অর্থাৎ 300 K-এ প্রতি 10⁹টি সংঘর্ষে মাত্র ~২টি সফল — আর মাত্র 10 K বাড়ালে সংখ্যাটি প্রায় দ্বিগুণ (×1.91)। হুকের প্রশ্নের উত্তর এখানেই: সংঘর্ষ সামান্য বাড়ে, কিন্তু যথেষ্ট শক্তির সংঘর্ষ সূচকীয়ভাবে বাড়ে।
লগারিদম রূপ ও লেখচিত্র
দুই পাশে স্বাভাবিক লগারিদম (natural log) নিলে:
এটি সরলরেখার সমীকরণ : বনাম আঁকলে সরলরেখা পাওয়া যায়, যার ঢাল (slope) (log₁₀ হলে ), একক কেলভিন (K)। তাই বিভিন্ন তাপমাত্রায় মেপে লেখচিত্রের ঢাল থেকে বের করা যায়: ।
দুই তাপমাত্রার সূত্র
ও তাপমাত্রায় হার ধ্রুবক ও হলে, দুটি সমীকরণ বিয়োগ করে:
উদাহরণ (বই, পৃ. ৪২৯): kJ/mol, 27 °C থেকে 37 °C:
“10 °C বাড়লে হার দ্বিগুণ” — নিয়মটি কখন খাটে?
এটি একটি চলতি নিয়ম (rule of thumb), প্রকৃতির সূত্র নয়। দুই তাপমাত্রার সূত্র থেকে 300 K-এর কাছে হার দ্বিগুণ করতে কত K লাগে:
| (kJ/mol) | 20 | 50 | 100 | 200 |
|---|---|---|---|---|
| হার দ্বিগুণ হতে লাগে | 28.4 K | 10.7 K | 5.3 K | 2.6 K |
অর্থাৎ নিয়মটি শুধু kJ/mol ও ঘরের তাপমাত্রার কাছে ঠিক। যত বড়, বিক্রিয়া তাপমাত্রার প্রতি তত বেশি সংবেদনশীল (sensitive) — কিন্তু একই তাপমাত্রায় তার তত ছোট।
একই A-যুক্ত দুটি বিক্রিয়ার একটির Ea = 50 kJ/mol, অন্যটির 100 kJ/mol। 298 K-এ কোনটি সঠিক?
ধাপ ৭: এবার নিজে করে দেখো
এখন সব ধারণা একসাথে। নিচের বাক্সে A (নীল) আর B (সবুজ) অণু ছোটাছুটি করছে: A + B → AB। প্রতিটি A-এর কিনারার কমলা অংশ হলো তার “বিক্রিয়ার দিক” — সেখানে B যথেষ্ট শক্তি নিয়ে লাগলে তবেই AB (বেগুনি) তৈরি হয়।
- কণার বাক্স ট্যাবে তাপমাত্রা, A ও B-এর কণা সংখ্যা (ঘনমাত্রা), Ea, ΔH, স্থানিক উৎপাদক p আর প্রভাবক বদলাও।
- প্রতিটি সেটিংয়ে ⏱ মাপো চাপো — বাক্স 60 সেকেন্ড ধরে সংঘর্ষ গুনে পর্যবেক্ষণ খাতায় (observation notebook) একটি সারি লেখে: সংঘর্ষ/s, সফল/s (= হার), আর k।
- আরহেনিয়াস লেখচিত্র ট্যাবে তোমার মাপ, বা N₂O₅ আর HI-এর বাস্তব উপাত্ত দিয়ে ln k বনাম 1/T এঁকে Ea বের করো; সেখানে দুই তাপমাত্রার সূত্রের একটি ক্যালকুলেটরও আছে।
- চ্যালেঞ্জগুলো একে একে শেষ করো।
সংঘর্ষের বাক্স ও আরহেনিয়াস লেখচিত্র
Collision box (A + B → AB) & Arrhenius plotচলন্ত সংখ্যাগুলো শেষ 4 s-এর গড়, তাই কাঁপে। “মাপো” চাপলে বাক্স 60 s (দ্রুত চালিয়ে) গুনে খাতায় একটি সারি লেখে। বিক্রিয়ক ফুরিয়ে না যেতে প্রতিটি AB তৈরির পর নতুন A ও B ঢোকে — ঘনমাত্রা স্থির থাকে। বাক্সের Ea, একক ও আকার কাল্পনিক (illustrative, reduced units)।
এই বিক্রিয়ার শক্তি-লেখ (energy profile)। হার ঠিক করে শুধু Ea আর T — ΔH নয়।
চ্যালেঞ্জ (challenges)
0/7- শুধু ঘনমাত্রা (concentration) বদলে হার (rate) দ্বিগুণ করো: একটি মাপ নাও, তারপর অন্য সব এক রেখে A বা B-এর কণা দ্বিগুণ করে আবার মাপো।
- Ea অর্ধেক করো (স্লাইডারে বা প্রভাবক, catalyst দিয়ে), অন্য সব এক রেখে মাপো। ঘনমাত্রা দ্বিগুণ করার চেয়ে কি বেশি লাভ?
- একই বাক্সে তাপমাত্রা অন্তত 100 K বাড়িয়ে দুবার মাপো। মোট সংঘর্ষ আর সফল সংঘর্ষ — কোনটি কত গুণ বাড়ল?
- একটি তাপহারী (endothermic, ΔH > 0) বিক্রিয়া বানাও যা একটি তাপোৎপাদী (exothermic, ΔH < 0) বিক্রিয়ার চেয়ে দ্রুত চলে (একই T ও ঘনমাত্রায় দুটি মাপ)।
- আরহেনিয়াস মোড: একই বাক্সে অন্তত ৪টি তাপমাত্রায় (মোট পরিসর ≥ 150 K) মাপো, তারপর “আরহেনিয়াস লেখচিত্র” ট্যাবে ln k বনাম 1/T থেকে Ea বের করো।
- “আরহেনিয়াস লেখচিত্র” ট্যাবের দুই-তাপমাত্রার সূত্রে Ea = 50 kJ/mol ও T₁ = 300 K রাখো: T₂ কত হলে হার দ্বিগুণ হয়?
- বাস্তব উপাত্ত: N₂O₅ বেছে শুধু 25 °C আর 65 °C-এর বিন্দু দুটি রাখো (বাকিগুলো চেপে বাদ দাও) — Ea কত?
পর্যবেক্ষণ খাতা (observation notebook)
এখনো কোনো মাপ নেই। বাক্সের সেটিং ঠিক করে “মাপো” চাপো।
বই পড়ার সময় সাবধান — পাঠ্যবইয়ের এই অংশে কয়েকটি ভুল আছে:
- পৃ. ৪৩০: “সক্রিয়ণ শক্তি যত বেশি, লেখচিত্রের ঢাল তত খাড়া এবং হার ধ্রুবক তত বেশি” — শেষ অংশটি ভুল। , তাই একই তাপমাত্রায় বড় মানে ছোট । বড় -এর শুধু তাপমাত্রা-সংবেদনশীলতা (ঢাল) বেশি।
- পৃ. ৪৪০: “বিক্রিয়ার হার সক্রিয়ণ শক্তির মাত্রার ব্যস্তানুপাতিক” — ভুল। নির্ভরতা সূচকীয় (exponential), । 298 K-এ 100 থেকে 50 kJ/mol করলে বাড়ে প্রায় গুণ, 2 গুণ নয়।
- পৃ. ৪৩৯: "" — চিহ্ন উল্টো। সঠিক: (উৎপাদ − বিক্রিয়ক)। বইয়ের চিত্রের অবশ্য ঠিক।
- পৃ. ৪৩৬: “তাপহারী বিক্রিয়ার হার তুলনামূলকভাবে কম” — সাধারণ নিয়ম হিসেবে ভুল। হার নির্ভর করে ও -এর ওপর, -এর চিহ্নের ওপর নয়। তাপহারী বিক্রিয়ায় শুধু হতেই হবে। অনেক তাপোৎপাদী বিক্রিয়া খুব ধীর — যেমন H₂ ও O₂-এর মিশ্রণ ঘরের তাপমাত্রায় বছরের পর বছর বিক্রিয়া ছাড়াই থাকে।
- পৃ. ৪২৮: “আরহেনিয়াস প্রমাণ করেন যে 10 °C তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে প্রায় সব বিক্রিয়ার হার দ্বিগুণ বা তিনগুণ হয়” — এটি শুধু একটি চলতি নিয়ম, খাটে মোটামুটি –80 kJ/mol ও ঘরের তাপমাত্রার কাছে (ওপরের সারণি দেখো)।
- ছোটখাটো: বইয়ে -কে “আরহেনিয়াস সমীকরণ” বলা হয়েছে — এটি আসলে সংঘর্ষ তত্ত্বের রূপ; আরহেনিয়াসের নিজের সমীকরণ । পৃ. ৪২৯-এ লেখা, পরীক্ষায় 8.314 ব্যবহার করো। পৃ. ৪৩০-এ সূচক −19.48 ছাপা (হবে −19.43; উত্তর 3.63 × 10⁻⁹ ঠিক আছে)। পৃ. ৪৩৩-এ “2N₂O₅ → 4N₂O₄ + O₂” ছাপা — হবে 4NO₂।
ঘরে বসে পরীক্ষা: গরম আর ঠান্ডা পানিতে লাইট-স্টিক
লাইট-স্টিক (glow stick) ভাঙলে ভেতরে একটি রাসায়নিক বিক্রিয়া শুরু হয় যা আলো দেয় (রাসায়নিক দীপ্তি, chemiluminescence)। যত দ্রুত বিক্রিয়া, তত উজ্জ্বল আলো — আর তত তাড়াতাড়ি ফুরায়।
- একই রঙের দুটি লাইট-স্টিক নাও। একটি গ্লাসে বরফ-পানি, আরেকটিতে কলের গরম পানি (হাতে সহ্য হয় এমন, ~45 °C) নাও।
- দুটি স্টিক একসাথে বাঁকিয়ে চালু করো, একটি করে দুই গ্লাসে রাখো। অন্ধকার ঘরে উজ্জ্বলতা তুলনা করো।
- প্রতি 15 মিনিট পর দেখো কোনটি আগে নিভে আসে। খাতায় লেখো।
- গরম পানির স্টিকটি বের করে বরফ-পানিতে দাও — উজ্জ্বলতা কী হয়? ব্যাখ্যা করো আরহেনিয়াস সমীকরণ দিয়ে।
লাইট-স্টিক না পেলে: একটি এফারভেসেন্ট (effervescent) ভিটামিন-সি বা অ্যান্টাসিড ট্যাবলেট ঠান্ডা পানিতে আর আরেকটি গরম পানিতে (সমান পরিমাণ) ফেলে দেখো কোনটি কত সেকেন্ডে পুরোপুরি গলে যায়।
নিরাপত্তা: ফুটন্ত পানি ব্যবহার কোরো না — লাইট-স্টিক ফেটে যেতে পারে। স্টিক কাটবে না বা ভেতরের তরল চোখে-মুখে লাগাবে না; ব্যবহারের পর সাধারণ ময়লার সঙ্গে ফেলে দাও। গরম পানি বড়দের সাহায্যে নাও।
পরীক্ষার প্রস্তুতি
১. সক্রিয়ণ শক্তি, কার্যকর সংঘর্ষ ও সক্রিয়ণকৃত জটিলের সংজ্ঞা দাও।
সক্রিয়ণ শক্তি (activation energy): বিক্রিয়ক অণুগুলোকে বিক্রিয়া করতে হলে তাদের গড় শক্তির চেয়ে যে ন্যূনতম বাড়তি শক্তি অর্জন করতে হয়।
কার্যকর সংঘর্ষ (effective collision): যে সংঘর্ষে বিক্রিয়ক কণাগুলো সক্রিয়ণ শক্তির সমান বা বেশি শক্তি নিয়ে সঠিক দিক থেকে আঘাত করে, ফলে বিক্রিয়া ঘটে।
সক্রিয়ণকৃত জটিল (activated complex): শক্তি-পর্বতের চূড়ায় পুরোনো বন্ধন আংশিক ভাঙা ও নতুন বন্ধন আংশিক গড়া অবস্থার সর্বোচ্চ শক্তির, অতি ক্ষণস্থায়ী পরমাণু-গুচ্ছ, যেমন A···B···C।
২. 2HI(g) → H₂(g) + I₂(g) বিক্রিয়ার হার ধ্রুবক 283 °C ও 508 °C-এ যথাক্রমে 3.52 × 10⁻⁷ ও 3.95 × 10⁻² L mol⁻¹ s⁻¹। (ক) সক্রিয়ণ শক্তি বের করো। (খ) 293 °C-এ হার ধ্রুবক কত?
(ক) K, K।
J/mol ≈ 187 kJ/mol।
(খ) K: , তাই L mol⁻¹ s⁻¹। মাত্র 10 °C-এ k প্রায় দ্বিগুণ।
৩. N₂O₅-এর বিয়োজনের হার ধ্রুবক 25 °C ও 65 °C-এ যথাক্রমে 3.46 × 10⁻⁵ s⁻¹ ও 4.87 × 10⁻³ s⁻¹। সক্রিয়ণ শক্তি কত?
K, K।
J/mol ≈ 103.6 kJ/mol। (সিমুলেশনের পাঁচ-বিন্দু লেখচিত্রেও ≈ 103 kJ/mol আসে।)
৪. 45 °C-এ কোনো বিক্রিয়ার হার ধ্রুবক 35 °C-এর দ্বিগুণ। সক্রিয়ণ শক্তি কত?
K, K, ।
J/mol ≈ 56.4 kJ/mol। তাই “10 °C-এ দ্বিগুণ” নিয়মটি Ea ≈ 50–60 kJ/mol-এর জন্যই খাটে।
৫. HI-এর বিয়োজনে ln k বনাম 1/T লেখচিত্রের ঢাল −2.24 × 10⁴ K। সক্রিয়ণ শক্তি কত? log k বনাম 1/T আঁকলে ঢাল কত হতো?
ln k বনাম 1/T: ঢাল , তাই J/mol = 186.2 kJ/mol।
log k বনাম 1/T-এর ঢাল K।
৬. একটি তাপোৎপাদী বিক্রিয়ায় Ea(fwd) = 120 kJ/mol ও ΔH = −40 kJ/mol। শক্তি-লেখ এঁকে বিপরীত বিক্রিয়ার সক্রিয়ণ শক্তি বের করো। “তাপহারী বিক্রিয়া সবসময় ধীর” — মন্তব্যটি যাচাই করো।
শক্তি-লেখে বিক্রিয়ক বাঁ দিকে, উৎপাদ ডানে 40 kJ/mol নিচে, চূড়া বিক্রিয়কের 120 kJ/mol ওপরে (ধাপ ৪-এর চিত্রের মতো)।
kJ/mol।
মন্তব্যটি ভুল। হার ঠিক করে , অর্থাৎ ও — -এর চিহ্ন নয়। kJ/mol ও kJ/mol-এর তাপহারী বিক্রিয়া, kJ/mol-এর তাপোৎপাদী বিক্রিয়ার চেয়ে (একই A ও T-এ) অনেক দ্রুত। তাপহারী বিক্রিয়ার একমাত্র শর্ত ।
৭. তাপমাত্রা সামান্য বাড়ালেও বিক্রিয়ার হার অনেক বেড়ে যায় কেন — সংঘর্ষ তত্ত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করো।
। তাপমাত্রা বাড়ালে দুটি জিনিস বাড়ে: (১) সংঘর্ষ হার , যা -এর সমানুপাতিক — 300 থেকে 310 K-এ মাত্র ~1.6%; (২) যথেষ্ট শক্তির সংঘর্ষের ভগ্নাংশ — Ea = 50 kJ/mol হলে 1.97 × 10⁻⁹ থেকে 3.76 × 10⁻⁹, প্রায় দ্বিগুণ। ম্যাক্সওয়েল-বোল্টজম্যান বণ্টনের উচ্চ-শক্তির লেজটি তাপমাত্রার সঙ্গে সূচকীয়ভাবে বাড়ে, তাই হার এত দ্রুত বাড়ে।