পাঠ ৬ / ১৩অনুচ্ছেদ ৪.৬, ৪.৬.১–৪.৬.৩, ৪.৭
লা-শাতেলিয়ারের নীতি ও শিল্পোৎপাদনLe Chatelier’s principle, the Haber and contact processes
একটি সিরিঞ্জে (syringe) বাদামি রঙের গ্যাস ভরে মুখ বন্ধ করা আছে। ভেতরে আসলে দুটি গ্যাস: বাদামি নাইট্রোজেন ডাইঅক্সাইড (nitrogen dioxide, NO₂) আর বর্ণহীন ডাইনাইট্রোজেন টেট্রোক্সাইড (dinitrogen tetroxide, N₂O₄)। নিজে প্লাঞ্জার চাপো, তারপর সিরিঞ্জটি বরফ-পানি আর গরম পানিতে ডোবাও:
সিরিঞ্জের মুখ বন্ধ। ভেতরে বাদামি নাইট্রোজেন ডাইঅক্সাইড (NO₂) আর বর্ণহীন ডাইনাইট্রোজেন টেট্রোক্সাইড (N₂O₄) সাম্যাবস্থায় (equilibrium) আছে: N₂O₄ ⇌ 2NO₂। এবার প্লাঞ্জার (plunger) চাপো, আর রঙের দিকে চোখ রাখো।
- প্লাঞ্জার চাপো — রং প্রথমে কেমন হলো, কয়েক সেকেন্ড পরে কেমন?
- সিরিঞ্জটি বরফ-পানিতে (ice water) ডোবাও।
- এবার গরম পানিতে (hot water) ডোবাও।
চাপ দেওয়ার পর রং প্রথমে গাঢ় হয় — এটা স্বাভাবিক, একই গ্যাস অর্ধেক জায়গায়। কিন্তু তারপর রং নিজে থেকেই একটু ফিকে হয়ে যায়, যেন সিস্টেমটি চাপের বিরুদ্ধে “পাল্টা লড়ছে”। গরম করলে গাঢ়, ঠান্ডা করলে ফিকে। কেন? আর এই “পাল্টা লড়াই” কাজে লাগিয়ে কারখানায় কীভাবে বছরে কোটি টন সার (fertiliser) আর সালফিউরিক এসিড তৈরি হয়?
এই পাঠে ধাপে ধাপে এগোব:
- আগে মনে করি — সাম্যাবস্থা (equilibrium), সাম্যধ্রুবক (equilibrium constant, K) আর বিক্রিয়া অনুপাত (reaction quotient, Q)
- লা-শাতেলিয়ারের নীতি (Le Chatelier’s principle)
- ঘনমাত্রা (concentration) বদলালে
- চাপ (pressure) বা আয়তন (volume) বদলালে
- তাপমাত্রা (temperature) বদলালে — একমাত্র যেটি K-কেই বদলে দেয়
- প্রভাবক (catalyst) দিলে
- শিল্পে লা-শাতেলিয়ার — হেবার পদ্ধতি (Haber process) ও স্পর্শ পদ্ধতি (contact process)
- এবার নিজে করে দেখো — কারখানা চালানোর সিমুলেশন (simulation)
ধাপ ১: আগে মনে করি — সাম্যাবস্থা, K আর Q
উভমুখী বিক্রিয়ায় (reversible reaction) সম্মুখ (forward) আর পশ্চাৎ (backward) বিক্রিয়া একসঙ্গে চলে। যখন দুটির হার (rate) সমান হয়ে যায়, তখন বিক্রিয়ক (reactants) আর উৎপাদের (products) ঘনমাত্রা আর বদলায় না — এটাই রাসায়নিক সাম্যাবস্থা (chemical equilibrium)। ভেতরে অণুরা তখনও বিক্রিয়া করছে; সাম্যাবস্থা গতিশীল (dynamic)।
হেবার বিক্রিয়ার কথাই ধরো:
যেকোনো মুহূর্তের ঘনমাত্রা দিয়ে হিসাব করা রাশিটিকে বলে বিক্রিয়া অনুপাত (reaction quotient), । সাম্যাবস্থায় পৌঁছালে এটির মান হয় একটি ধ্রুব সংখ্যা — সাম্যধ্রুবক :
নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় স্থির। যেমন 700 K-এ হেবার বিক্রিয়ার (L² mol⁻²)। আর তুলনা করলেই বলা যায় বিক্রিয়া কোন দিকে চলবে:
700 K-এ একটি পাত্রে [N₂] = 1.0 M, [H₂] = 1.0 M, [NH₃] = 1.0 M। এখানে Q = 1.0, আর K = 0.29। বিক্রিয়া কোন দিকে চলবে?
ধাপ ২: লা-শাতেলিয়ারের নীতি
১৮৮৪ সালে ফরাসি রসায়নবিদ অঁরি লা-শাতেলিয়ার (Henri Le Chatelier) সাম্যাবস্থার আচরণ এক বাক্যে বলেন:
লা-শাতেলিয়ারের নীতি: সাম্যাবস্থায় থাকা কোনো উভমুখী বিক্রিয়ার একটি নিয়ামক (factor) — যেমন ঘনমাত্রা, চাপ বা তাপমাত্রা — পরিবর্তন করলে সাম্যাবস্থা এমন দিকে সরে যায়, যাতে ওই পরিবর্তনের প্রভাব আংশিকভাবে প্রশমিত (counteracted) হয়।
খেয়াল করো দুটি শব্দ: সরে যায় (shift) আর আংশিকভাবে। সিস্টেম পরিবর্তনটিকে পুরোপুরি বাতিল করতে পারে না — সিরিঞ্জে চাপ দেওয়ার পর রং একটু ফিকে হয়েছিল, কিন্তু শুরুর রঙে ফেরেনি।
নীতিটি আসলে আর -এর খেলা। মনে রাখার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা:
- ঘনমাত্রা বা চাপ বদলালে বদলায় না — বদলায় । তারপর বিক্রিয়া চলে যতক্ষণ না আবার -এর সমান হয়।
- শুধু তাপমাত্রা বদলালে নিজেই বদলে যায়।
- প্রভাবক বা কিছুই বদলায় না।
নিচের কোন পরিবর্তনে একটি বিক্রিয়ার সাম্যধ্রুবক K-এর মান বদলায়?
ধাপ ৩: ঘনমাত্রা বদলালে
বইয়ের উদাহরণটি নিচের যন্ত্রে নিজে করো। 700 K-এ সাম্য মিশ্রণে আছে 0.50 M N₂, 3.0 M H₂ আর 1.98 M NH₃। প্রথমে “+ N₂ যোগ” চাপো, তারপর অন্য ঝটকাগুলোও (stresses) দিয়ে দেখো। ওপরের Q-মিটারে হলুদ Q বিন্দুটি কোথায় লাফ দেয় আর কোথায় ফিরে আসে, খেয়াল করো:
700 K-এ N₂ + 3H₂ ⇌ 2NH₃ মিশ্রণটি সাম্যাবস্থায় আছে: Q = K। ওপরের যেকোনো বোতাম চেপে সাম্যাবস্থাকে একটা “ঝটকা” (stress) দাও।
হিসাবটা এরকম। শুরুতে
N₂-এর ঘনমাত্রা 1.5 M করার ঠিক পরমুহূর্তে হর (denominator) বড় হয়ে যায়:
, তাই বিক্রিয়া ডানে চলে। ধরো mol/L N₂ খরচ হলো; তাহলে H₂ খরচ , NH₃ তৈরি :
নতুন সাম্যে [N₂] = 1.31 M, [H₂] = 2.44 M, [NH₃] = 2.35 M। যোগ করা 1.0 M N₂-এর মাত্র 0.19 M খরচ হলো — পরিবর্তন আংশিক প্রশমিত হলো। (বইয়ে 2.43 আর 2.36 লেখা, লেখচিত্র থেকে পড়া মান — পার্থক্য সামান্য।)
সাধারণ নিয়ম:
| পরিবর্তন | Q-এর কী হয় | সাম্য সরে |
|---|---|---|
| বিক্রিয়ক যোগ / উৎপাদ সরানো | ডানে (forward) | |
| উৎপাদ যোগ / বিক্রিয়ক সরানো | বামে (backward) |
কঠিন (solid) বা বিশুদ্ধ তরল (pure liquid) যোগ করলে কিছুই হয় না। এদের সক্রিয় ভর (active mass) সবসময় 1, তাই -এর সমীকরণে এরা থাকেই না। যেমন বদ্ধ পাত্রে -এর জন্য । আরও CaCO₃ দিলে কিছু বদলায় না; কিন্তু বাইরে থেকে CO₂ দিলে কিছু CO₂ CaO-এর সঙ্গে মিশে CaCO₃ হয়, যতক্ষণ না আবার আগের মানে ফেরে।
বদ্ধ পাত্রে C(s) + O₂(g) ⇌ CO₂(g) সাম্যাবস্থায় আছে। বাইরে থেকে আরও কার্বন (C) গুঁড়া দিলে কী হবে?
ধাপ ৪: চাপ বা আয়তন বদলালে
গ্যাসীয় বিক্রিয়ায় আয়তন কমালে (চাপ বাড়ালে) প্রতিটি গ্যাসের ঘনমাত্রা একই গুণ বাড়ে। এর ফল নির্ভর করে দুই পাশে গ্যাসের মোল সংখ্যার পার্থক্যের ওপর, (শুধু গ্যাস গোনা হয়)। নিচে তিনটি বিক্রিয়ায় নিজে পিস্টন (piston) চেপে দেখো, তারপর আর্গন (argon) দিয়েও দেখো:
N₂ + 3H₂ ⇌ 2NH₃ (700 K): 4 অণু → 2 অণু, Δn = −2
স্লাইডার (slider) টেনে আয়তন (volume) কমাও — চাপ (pressure) বাড়বে। কোন দিকে সাম্য সরে, ডানের দণ্ডগুলোতে (bars) দেখো।
Q দিয়ে ব্যাখ্যা। হেবার মিশ্রণের আয়তন অর্ধেক করলে প্রতিটি ঘনমাত্রা দ্বিগুণ হয়: [N₂] = 1.0, [H₂] = 6.0, [NH₃] = 3.96 M।
লবে গুণ, হরে গুণ — তাই হয় । বিক্রিয়া ডানে চলে, যেদিকে গ্যাসের অণু কম (4 → 2)। অণু কমলে চাপও কমে — ঝটকা প্রশমিত হয়।
Kp দিয়ে ব্যাখ্যা। মোট চাপ আর মোল ভগ্নাংশ (mole fraction) হলে আংশিক চাপ (partial pressure) । তাই
স্থির, অথচ বাড়লে কমে — তাই সমতা রাখতে বাড়তেই হবে।
| বিক্রিয়া | চাপ বাড়ালে | |
|---|---|---|
| N₂ + 3H₂ ⇌ 2NH₃ | −2 | ডানে, NH₃ বাড়ে |
| 2SO₂ + O₂ ⇌ 2SO₃ | −1 | ডানে, SO₃ বাড়ে |
| PCl₅ ⇌ PCl₃ + Cl₂ | +1 | বামে, PCl₅ বাড়ে |
| N₂O₄ ⇌ 2NO₂ | +1 | বামে, NO₂ কমে (সিরিঞ্জে রং ফিকে হলো!) |
| H₂ + I₂ ⇌ 2HI, N₂ + O₂ ⇌ 2NO | 0 | কোনো প্রভাব নেই |
নিষ্ক্রিয় গ্যাস (inert gas)। আয়তন স্থির রেখে আর্গন দিলে মোট চাপ বাড়ে, কিন্তু কোনো বিক্রিয়ক বা উৎপাদের আংশিক চাপ বদলায় না — সাম্য সরে না। চাপ স্থির রেখে দিলে আয়তন বাড়াতে হয়, তখন সব আংশিক চাপ কমে, আর সাম্য বেশি মোলের দিকে সরে।
CO(g) + H₂O(g) ⇌ CO₂(g) + H₂(g) — সাম্যাবস্থায় চাপ দ্বিগুণ করলে H₂-এর পরিমাণের কী হবে?
ধাপ ৫: তাপমাত্রা বদলালে — K নিজেই বদলায়
তাপকে বিক্রিয়ার একটি “উপাদান” হিসেবে ভাবো:
- তাপোৎপাদী (exothermic, ) বিক্রিয়ায় তাপ উৎপাদের দিকে: । তাপমাত্রা বাড়ালে সাম্য বামে সরে, K কমে।
- তাপহারী (endothermic, ) বিক্রিয়ায় তাপ বিক্রিয়কের দিকে: । তাপমাত্রা বাড়ালে সাম্য ডানে সরে, K বাড়ে।
এখানে ঘনমাত্রা নয়, সাম্যধ্রুবকটাই বদলায়। নিচের লেখচিত্রে লাল দাগ টেনে নিজে দেখো (y-অক্ষ লগ স্কেলে, log scale):
○ সাদা বৃত্ত: বইয়ের হেবার Kc সারণি (300–1000 K)। রেখা: NIST-JANAF তাপগতীয় উপাত্ত (thermodynamic data) থেকে গণনা। y-অক্ষ লগ স্কেলে (log scale) — প্রতি ঘর 100 গুণ।
লাল দাগটি (বা নিচের স্লাইডার) টেনে তাপমাত্রা বদলাও, আর দুটি K কোন দিকে যায় দেখো।
300 K থেকে 1000 K-এ যেতে হেবার বিক্রিয়ার কমে প্রায় গুণ। তাপমাত্রার সঙ্গে K-এর এই সম্পর্ক দেয় ভ্যান্ট হফ সমীকরণ (van ’t Hoff equation):
বনাম লেখচিত্র প্রায় সরলরেখা, ঢাল (slope) । তাপোৎপাদী বিক্রিয়ার ঢাল ধনাত্মক, তাপহারীর ঋণাত্মক। দুটি তাপমাত্রায় K-এর সম্পর্ক:
(এখানে J mol⁻¹ K⁻¹; এই সূত্র স্থির ধরে নেয়। হেবার বিক্রিয়ায় উচ্চ তাপমাত্রায় একটু বদলায়, তাই ওপরের লেখচিত্র NIST-JANAF সারণির আসল উপাত্ত থেকে আঁকা।)
N₂(g) + O₂(g) ⇌ 2NO(g), ΔH° = +180.6 kJ। গাড়ির ইঞ্জিনের প্রচণ্ড তাপে NO (বায়ু দূষক) কেন বেশি তৈরি হয়?
ধাপ ৬: প্রভাবক দিলে
প্রভাবক (catalyst) বিক্রিয়ার জন্য কম সক্রিয়ণ শক্তির (activation energy) একটি পথ খুলে দেয়। কিন্তু সেই পথ দুই দিকেই খোলা — সম্মুখ ও পশ্চাৎ দুই বিক্রিয়াই সমান গুণ দ্রুত হয়:
তাই প্রভাবক সাম্যের অবস্থান (position of equilibrium) বা K বদলায় না, শুধু সাম্যে দ্রুত পৌঁছে দেয়। শিল্পে এটাই সোনা — হেবার পদ্ধতিতে আয়রন (Fe) প্রভাবক ছাড়া N≡N বন্ধন ভেঙে অ্যামোনিয়া তৈরি প্রায় অসম্ভব ধীর।
A(g) + B(g) ⇌ 2C(g) সাম্যাবস্থায় আছে। প্রভাবক যোগ করলে C-এর পরিমাণের কী হবে?
ধাপ ৭: শিল্পে লা-শাতেলিয়ার
(ক) হেবার পদ্ধতি — অ্যামোনিয়া
বাংলাদেশের ইউরিয়া সার কারখানাগুলো এই বিক্রিয়ায় অ্যামোনিয়া (ammonia) বানিয়ে তা থেকে ইউরিয়া (urea) তৈরি করে। লা-শাতেলিয়ার কী বলে, আর কারখানা আসলে কী করে:
| নিয়ামক | লা-শাতেলিয়ার অনুযায়ী সেরা | কারখানায় ব্যবহার | কেন আপস (compromise) |
|---|---|---|---|
| চাপ | যত বেশি তত ভালো (Δn = −2) | ~150–300 atm | বেশি চাপে সংকোচনের (compression) বিদ্যুৎ আর পুরু ইস্পাতের পাত্রের খরচ অনেক |
| তাপমাত্রা | যত কম তত ভালো (তাপোৎপাদী) | ~400–450 °C | ঠান্ডায় বিক্রিয়া অসম্ভব ধীর; ~450 °C-এ সাম্যে কম NH₃, কিন্তু দ্রুত |
| প্রভাবক | সাম্যে প্রভাব নেই | Fe, প্রবর্ধক (promoter) K₂O ও Al₂O₃ | সাম্যে দ্রুত পৌঁছায় |
| উৎপাদ সরানো | ডানে টানে | NH₃ ঠান্ডা করে তরল বানিয়ে আলাদা করা | — |
| অনুপাত | — | N₂ : H₂ = 1 : 3 | সমীকরণের অনুপাতেই সর্বোচ্চ % NH₃ |
450 °C আর 200 atm-এ সাম্যেও মাত্র প্রায় 25–30% NH₃ থাকে, আর এক পাসে (single pass) রূপান্তরক সাম্যের পুরোটা পৌঁছায় না — বেরোয় প্রায় 15–20%। বাকি গ্যাস বারবার ঘুরে আসে বলে শেষ পর্যন্ত প্রায় সব কাঁচামাল NH₃ হয়।
(খ) স্পর্শ পদ্ধতি — সালফিউরিক এসিড
এখানেও বিক্রিয়া তাপোৎপাদী আর । কিন্তু এর অনেক বড় — 450 °C-এ, মাত্র 1–2 atm চাপেই প্রায় 98–99% SO₂ রূপান্তরিত হয়। তাই:
- তাপমাত্রা 420–450 °C: এর নিচে V₂O₅ প্রভাবক প্রায় কাজই করে না, এর ওপরে সাম্যে রূপান্তর কমে।
- চাপ 1–2 atm: চাপ বাড়িয়ে লাভ এক শতাংশেরও কম, খরচ অনেক।
- অতিরিক্ত বায়ু (excess air): O₂ (একটি বিক্রিয়ক) বেশি দিলে সাম্য ডানে সরে।
- দ্বিগুণ শোষণ (double absorption): প্রথম শোষণে SO₃ সরিয়ে বাকি গ্যাস আবার প্রভাবকে পাঠানো হয় — উৎপাদ সরানোয় সাম্য আবার ডানে, মোট রূপান্তর 99.5%-এর বেশি।
হেবার পদ্ধতিতে 200 °C-এ সাম্যে অনেক বেশি NH₃ পাওয়া যায়, তবু কারখানা ~450 °C ব্যবহার করে কেন?
ধাপ ৮: এবার নিজে করে দেখো
এবার তুমি কারখানার প্রধান প্রকৌশলী (chief engineer)। নিচের সিমুলেশনে:
- তাপমাত্রা আর চাপ স্লাইডার টেনে দেখো সাম্যে NH₃ (নীল), এক পাসে NH₃ (কমলা), সাম্যে পৌঁছানোর সময় আর দৈনিক উৎপাদন কীভাবে বদলায়। লেখচিত্রে নীল রেখা কমতে থাকে, অথচ কমলা রেখা প্রথমে বাড়ে তারপর কমে — চূড়াটা কোথায়?
- প্রভাবক, পুনরাবর্তন (recycle) আর N₂ : H₂ অনুপাত বদলে লাভ সূচকের (profit index) দিকে চোখ রাখো (450 °C, 200 atm-এর কারখানা = 100)।
- ওপরের স্পর্শ (contact) ট্যাবে সালফিউরিক এসিডের রূপান্তরকও চালাও।
- প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থা খাতায় লেখো (record), আর চ্যালেঞ্জগুলো শেষ করো।
হেবার কারখানা ও স্পর্শ পদ্ধতি
Haber plant & contact processN₂(g) + 3H₂(g) ⇌ 2NH₃(g) ΔH° = −92 kJ
আদর্শ গ্যাস হিসেবে অনুমান (ideal-gas estimate), NIST-JANAF উপাত্ত থেকে; 300 atm পর্যন্ত মাপা মানের (Larson–Dodge) সঙ্গে ±5%-এর মধ্যে মেলে, 600–1000 atm-এ আসল গ্যাসে আরও কিছু বেশি NH₃ হয়। হার (rate), উৎপাদন ও লাভের সংখ্যাগুলো উদাহরণমূলক (illustrative) — ধারণা বোঝানোর জন্য, কারখানার মাপা মান নয়।
চ্যালেঞ্জ (challenges)
0/9- হেবার: সাম্যাবস্থায় (equilibrium) 90%-এর বেশি NH₃ পাওয়ার অবস্থা খুঁজে বের করো
- প্রভাবক চালু রেখে তাপমাত্রা (T) বদলে প্রতিদিনের NH₃ উৎপাদন (t/day) সর্বোচ্চ করো
- একই চাপে 200–250 °C আর 400–500 °C — দুটি অবস্থা খাতায় লেখো (record) আর তুলনা করো
- একই T, P-তে প্রভাবক (catalyst) চালু ও বন্ধ — দুটি সারি খাতায় লেখো
- পুনরাবর্তন (recycle) বন্ধ করে দেখো লাভের (profit) কী হয়
- N₂ : H₂ অনুপাত (ratio) বদলে খুঁজে বের করো কোন অনুপাতে সাম্যে %NH₃ সবচেয়ে বেশি (0/3 অনুপাত দেখা)
- লাভ সূচক (profit index) 100-এর বেশি করো
- স্পর্শ পদ্ধতি: একই তাপমাত্রায় 1–2 atm আর 8–10 atm চাপে সাম্যে রূপান্তর তুলনা করো
- স্পর্শ পদ্ধতি: মোট রূপান্তর (total conversion) 99.5%-এর বেশি করো
পর্যবেক্ষণ খাতা (observation notebook)
এখনো কিছু লেখা হয়নি। অবস্থা ঠিক করে “খাতায় লেখো” চাপো।
বই পড়ার সময় সাবধান — পাঠ্যবইয়ের এই অংশে কিছু ভুল আছে (NIST/NBS তাপগতীয় সারণির সঙ্গে মিলিয়ে):
- N₂O₄ → 2NO₂-এর ΔH = +55.3 kJ নয়, +57.2 kJ; PCl₅ → PCl₃ + Cl₂-এর ΔH = +90 kJ নয়, +87.9 kJ; N₂ + O₂ → 2NO-এর ΔH° = +182.6 kJ নয়, +180.6 kJ; 2SO₂ + O₂ → 2SO₃-এর ΔH = −197.8 kJ (বইয়ে −196.6)।
- একই মিশ্রণ (0.5 / 3.0 / 1.98 M, Kc ≈ 0.29) এক জায়গায় “400 °C”-এ, আরেক জায়গায় “700 K (427 °C)”-এ বলা হয়েছে। 700 K-টিই ঠিক — 400 °C (673 K)-এ Kc প্রায় 0.56।
- Kp-এর সূত্রে “x ≪ 1” ধরে — কিন্তু কারখানার অবস্থায় x প্রায় 0.4, মোটেই ছোট নয়। এই সংক্ষিপ্ত সূত্র x-কে প্রায় দ্বিগুণ দেখায়; পূর্ণ সূত্রটি ব্যবহার করো (নিচের প্রশ্ন ৩)।
- “শিল্পে 35–40% NH₃ পাওয়া যায়” — এটি প্রায় সাম্যের মান। রূপান্তরক থেকে এক পাসে বেরোয় মাত্র ~15–25%; অবিক্রিত গ্যাস পুনরাবর্তন করায় মোট রূপান্তর ~97%।
- হেবার প্রভাবকের প্রবর্ধক (promoter) মূলত K₂O ও Al₂O₃ (সঙ্গে CaO), “MgO, SiO₂” মূল প্রবর্ধক নয়।
- “পানিতে SO₃-এর দ্রবণীয়তা কম, তাই 98% H₂SO₄-এ শোষণ” — ভুল কারণ। SO₃ পানির সঙ্গে প্রচণ্ড তাপ ছেড়ে বিক্রিয়া করে H₂SO₄-এর সূক্ষ্ম কুয়াশা (acid mist) তৈরি করে, যা ধরা খুব কঠিন।
- “উচ্চচাপে SO₂ তরল হয়ে যায়, তাই উচ্চচাপ নয়” — 420–450 °C-এ SO₂ তার সংকট তাপমাত্রার (critical temperature, 157 °C) অনেক ওপরে, তরল হতেই পারে না। আসল কারণ: 1–2 atm-এই রূপান্তর ~99%, বেশি চাপের খরচ পোষায় না।
ঘরে বসে পরীক্ষা: লাল বাঁধাকপির রং দিয়ে সাম্যের সরণ
লাল বাঁধাকপির (red cabbage) রস একটি নির্দেশক (indicator)। এর রঙিন অণুর সাম্যাবস্থা: — HIn লালচে-গোলাপি, In⁻ সবুজ-নীল।
- কয়েকটি লাল বাঁধাকপির পাতা কুচি করে গরম পানিতে 10 মিনিট ভিজিয়ে রাখো, তারপর ছেঁকে বেগুনি রস নাও।
- একটি স্বচ্ছ গ্লাসে আধা কাপ পানি, কয়েক চামচ রস আর এক চিমটি খাবার সোডা (baking soda) দাও — রং সবুজাভ নীল হবে।
- এবার ফোঁটায় ফোঁটায় সিরকা (vinegar) দাও আর নাড়ো। H⁺ যোগ করলে সাম্য বামে সরে, রং বেগুনি থেকে গোলাপি হয়। আবার সোডা দিলে H⁺ খরচ হয়ে সাম্য ডানে সরে, রং ফেরে সবুজাভ নীলে।
- কয়েকবার এদিক-ওদিক করে দেখো, আর প্রতিবার কী যোগ করলে আর রং কী হলো, খাতায় লেখো।
বাড়তি পরীক্ষা: দুটি একই রকম কোমল পানীয়ের (soft drink) বোতল নাও, একটি ফ্রিজে আর একটি গরম পানিতে (কলের গরম পানি, ফোটানো নয়) 10 মিনিট রাখো। দুটি খোলার সময় কোনটি বেশি ফেনা দেয়? সাম্যে গ্যাস গলে যাওয়া তাপোৎপাদী, তাই গরমে কম CO₂ দ্রবণে থাকে।
নিরাপত্তা: বন্ধ বোতল কখনো আগুনে বা ফুটন্ত পানিতে গরম করবে না — ফেটে যেতে পারে। বোতল খোলার সময় মুখ দূরে রাখো। সিরকা চোখে লাগলে প্রচুর পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলো।
পরীক্ষার প্রস্তুতি
১. 700 K-এ N₂ + 3H₂ ⇌ 2NH₃ সাম্যে [N₂] = 0.50 M, [H₂] = 3.0 M, [NH₃] = 1.98 M (Kc = 0.291)। [N₂] বাড়িয়ে 1.5 M করা হলো। (ক) Qc কত, বিক্রিয়া কোন দিকে যাবে? (খ) নতুন সাম্য ঘনমাত্রা বের করো।
(ক) — বিক্রিয়া ডানে (forward) যাবে, NH₃ বাড়বে।
(খ) N₂ খরচ ধরে: । মান বসিয়ে চেষ্টা (trial) করলে -এ বাম পাশ ।
নতুন সাম্য: [N₂] = 1.31 M, [H₂] = 2.44 M, [NH₃] = 2.35 M। যোগ করা 1.0 M N₂-এর মাত্র 0.19 M খরচ হলো — পরিবর্তন আংশিক প্রশমিত।
২. ওপরের সাম্য মিশ্রণের আয়তন অর্ধেক করা হলো। Qc হিসাব করে দেখাও সাম্য কোন দিকে সরবে। Δn দিয়ে উত্তরটি মিলিয়ে নাও।
আয়তন অর্ধেক → সব ঘনমাত্রা দ্বিগুণ: [N₂] = 1.0, [H₂] = 6.0, [NH₃] = 3.96 M।
। (0.29), তাই ডানে — আরও NH₃।
সাধারণভাবে আয়তন অর্ধেক করলে সব ঘনমাত্রা 2 গুণ হয়, আর হয় গুণ। এখানে , তাই হয় গুণ () — মিলে গেল। চাপ বাড়ালে সাম্য কম গ্যাস-মোলের দিকে সরে।
৩. 1 mol N₂ ও 3 mol H₂ থেকে 450 °C ও 200 atm-এ সাম্যে x mol N₂ বিক্রিয়া করে। ঐ তাপমাত্রায় Kp = 5.0 × 10⁻⁵ atm⁻²। Kp = 16x²(2−x)² / [27(1−x)⁴P²] ব্যবহার করে x আর সাম্যে NH₃-এর আয়তন % বের করো। “x ≪ 1” ধরে নিলে কী হয়?
সাম্যে মোল: N₂ = 1−x, H₂ = 3−3x, NH₃ = 2x, মোট = 4−2x।
উভয় পাশের বর্গমূল নিয়ে: ।
ধরলে , তাই , ।
NH₃-এর আয়তন % (মাপা মান Larson–Dodge সারণির সঙ্গে মেলে)।
বোর্ড পদ্ধতির সংক্ষিপ্ত সূত্র (, তাই , ): — আসল মানের (0.41) দ্বিগুণেরও বেশি, ত্রুটি প্রায় 125%! x ছোট না হলে এই সংক্ষেপ চলে না।
৪. (ব.বো. ২০২১) দুটি পাত্রে একই তাপমাত্রা ও চাপে: (i) N₂ + 3H₂ ⇌ 2NH₃, ΔH = −93 kJ; (ii) 2NH₃ ⇌ N₂ + 3H₂, ΔH = +93 kJ। দুটি পাত্রেই 10 kJ তাপ দিলে NH₃-এর পরিমাণে কোনো তারতম্য দেখা যাবে কি? ব্যাখ্যা করো।
দুটি আসলে একই সাম্যাবস্থা, শুধু উল্টো করে লেখা। তাপ দিলে দুই পাত্রেরই তাপমাত্রা বাড়ে।
(i)-এ সম্মুখ বিক্রিয়া তাপোৎপাদী, তাই সাম্য বামে সরে — NH₃ কমে। (ii)-এ সম্মুখ বিক্রিয়া তাপহারী, তাই সাম্য ডানে সরে — NH₃ ভাঙে, এখানেও NH₃ কমে।
দুই পাত্রেই NH₃ কমবে, আর একই অবস্থায় (একই T, P, মোট উপাদান) দুটির সাম্য-মিশ্রণ একই হবে — লেখার দিক বদলালে রসায়ন বদলায় না, শুধু K হয় উল্টো (K₂ = 1/K₁)।
৫. (ঢা.বো. ২০২১) 500 °C-এ 2 L বদ্ধপাত্রে 2NOX(g) ⇌ 2NO(g) + X₂(g); ΔH = −ve। NOX-এর বিয়োজন বাড়াতে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া যায়, বিশ্লেষণ করো।
- তাপমাত্রা কমানো: সম্মুখ (বিয়োজন) বিক্রিয়া তাপোৎপাদী, তাই তাপমাত্রা কমালে K বাড়ে — বিয়োজন বাড়ে (যদিও হার কমে)।
- চাপ কমানো / আয়তন বাড়ানো: বামে 2 মোল, ডানে 3 মোল গ্যাস (Δn = +1)। চাপ কমালে সাম্য বেশি মোলের দিকে — ডানে।
- উৎপাদ সরানো: NO বা X₂ সরিয়ে নিলে Q < K, সাম্য ডানে।
- প্রভাবক: বিয়োজনের পরিমাণ বাড়ায় না, শুধু সাম্যে দ্রুত পৌঁছায়। স্থির আয়তনে নিষ্ক্রিয় গ্যাস দিলেও কিছু হয় না।
৬. স্পর্শ পদ্ধতিতে SO₂-এর জারণের অত্যনুকূল অবস্থা লেখো এবং প্রতিটির কারণ ব্যাখ্যা করো। উৎপন্ন SO₃ সরাসরি পানিতে শোষণ করা হয় না কেন?
2SO₂ + O₂ ⇌ 2SO₃, ΔH° = −197.8 kJ, Δn = −1।
- 420–450 °C: তাপোৎপাদী, তাই কম তাপমাত্রায় সাম্য ডানে; কিন্তু V₂O₅ প্রায় 400 °C-এর নিচে খুব ধীর। তাই আপস তাপমাত্রা।
- 1–2 atm: Δn = −1 বলে চাপে রূপান্তর বাড়ে, কিন্তু K বড় বলে 1–2 atm-এই ~98–99%; বেশি চাপের খরচ অর্থহীন।
- অতিরিক্ত বায়ু (excess O₂): বিক্রিয়কের ঘনমাত্রা বাড়ায় সাম্য ডানে।
- V₂O₅ প্রভাবক: দ্রুত সাম্যে পৌঁছায়।
- দ্বিগুণ শোষণ: SO₃ সরিয়ে বাকি গ্যাস আবার প্রভাবকে — উৎপাদ সরানোয় সাম্য ডানে, মোট > 99.5%।
SO₃ পানির সঙ্গে প্রচণ্ড তাপোৎপাদী বিক্রিয়া করে (SO₃ + H₂O → H₂SO₄, ΔH ≈ −132 kJ/mol) — এসিডের সূক্ষ্ম কুয়াশা তৈরি হয়, যা ধরা যায় না। তাই 98% H₂SO₄-এ শোষণ করে ওলিয়াম (H₂S₂O₇) বানানো হয়, পরে পানি মিশিয়ে H₂SO₄।